আমারই ঠিকানা
তাই বৃদ্ধাশ্রম
আভিধানিকভাবে বৃদ্ধ ও আশ্রম শব্দ দুটি মিলে হয়েছে বৃদ্ধাশ্রম। শব্দগতভাবে অর্থ দাঁড়ায় বৃদ্ধের আশ্রয়স্থল। বৃদ্ধাশ্রম হলো মূলত বৃদ্ধ নারী-পুরুষের আবাসস্থল। এটি হচ্ছে বয়স্কদের আবাসন ব্যবস্থা। জীবনের শেষ সময়ের আবাসস্থল বা বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্র ইত্যাদি। শেষ জীবনে সন্তানকে অবলম্বন করে বাঁচার চেষ্টায় সারাজীবন নিজের সর্বস্ব দিয়ে ছেলে মেয়েদের বড় করে তুলে। বৃদ্ধাবস্থায় পরিবার বা আত্মীয়স্বজনের আশ্রয় ব্যতীত সরকারি-বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় লালিত-পালিত হওয়ার স্থানকে বৃদ্ধাশ্রম বলে।
প্রয়াত শিল্পী ফকির আলমগীর একটি গানের কথা মনে পরছে এই মুহুর্তে
মায়ের একধার দুধের দাম কাটিয়া গায়ের চাম
পাপোশ বানাইলে ঋণের শোধ হবে না
এমন দরদি ভবে, কেউ হবেনা আমার মা-গো
ছোট বেলায় বাবা-মা ছিলেন
সন্তানের সবচেয়ে বেশী আপন,
যাদের ছাড়া সন্তান কিছুই করতে পারত না। যারা নিজেদের আরাম বিসর্জন দিয়ে সন্তান মানুষ করেছেন, নিজের সব দুঃখ-কষ্ট বুকে
চেপে সন্তানের হাসিমাখা মুখ দেখার জন্য মা-বাবা ব্যাকুল
থাকতেন,
সন্তান না খেলে যারা থাকতেন অনাহারে, না ঘুমালে থাকতেন নির্ঘুম, অসুস্থ হ’লে ঠায় বসে থাকতেন শিয়রে, যে বাবা-মা তিল তিল করে নিজেদের সবকিছু ত্যাগ দিয়েছেন সন্তানকে
মানুষ করার জন্য,
যে বাবা নিজের পকেট খরচের টাকা বাঁচিয়ে রাখতেন তার সন্তানের
টিউশন ফী অথবা টিফিনের টাকার জন্য, যারা নিজের
অসুস্থতার কথা না ভেবে কেবল তার সন্তানদের কথা চিন্তা করে প্রত্যুষেই নেমে পড়তেন
রুজির সন্ধানে জীবন যুদ্ধে, সাংসারিক যুদ্ধে। নিষিদ্ধ সম্পাদকীয় হেলাল হাফিজের
লিখা যে জলে আগুন জ্বলে: এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার
শ্রেষ্ঠ সময়
এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার
শ্রেষ্ঠ সময়
সন্তান বড় হয়ে ওঠা পর্যন্ত সমস্ত আবদার মেনে নিতেন বাবা-মা।
এসব কথা কোন সন্তানকে মনে করিয়ে দেয়ার
প্রয়োজন নেই।
পড়ালেখা শেষ করে সন্তান হয় স্বাবলম্বী আর
এর মাঝে বাবা-মা এর বয়স
বাড়তে থাকে, কমতে থাকে
শরীরের শক্তি, তাদের একমাত্র
অবলম্বন হয়ে পড়ে সন্তান। সন্তান তখন নিজের সংসারের মায়াজালে আবদ্ধ হয়ে অতীতের সব স্মৃতি ভুলে
নিজের মত করে সাজিয়ে ও মানিয়ে নেয় সবকিছু। পিতা-মাতার প্রতি শুরু হয় অবহেলা আর ক্রমে অবহেলার মাত্রা বাড়ে এবং বাড়তে বাড়তে এক সময়
চরম পর্যায়ে পৌঁছায়। তাদের সন্তান লালন-পালন এবং তাদের সন্তানের
ভবিষ্যত চিন্তায় মগ্ন হয়ে বৃদ্ধ বা বয়স্ক বাবা-মাকে
পরিবারের বোঝা মনে করে। নিষিদ্ধ সম্পাদকীয় হেলাল হাফিজের লিখা যে জলে আগুন জ্বলে: সেখানে সংসারী থাকে, সংসার
বিরাগী থাকে,
কেউ আসে রাজপথে সাজাতে সংসার ।
কেউ আসে জ্বালিয়ে বা জ্বালাতে
সংসার
শাশ্বত শান্তির যারা তারাও
যুদ্ধে আসে।
স্বেচ্ছায়
ও অনিচ্ছায় বৃদ্ধাশ্রমে বৃদ্ধদের অবস্থানের কিছু কারণ
ক) পরিবারের বোঝা।
খ) পরিবারের উপর্জন্ক্ষম ব্যক্তির
অভাব।
গ) পরিবারের সদস্যদের মাঝে বনিবনার
অভাব।
ঘ) অনেকে আবার একাকিত্ব ঘোচাতে
বৃদ্ধাশ্রমে আসে।
ঙ) পথহারা অসহায়।
চ) কুড়িয়ে পাওয়া।
ছ) উচ্চশিক্ষিত, উচ্চপদস্থ
সন্তানের বৃদ্ধ পিতা-মাতা।
ঙ) সম্পদশালী পিতা-মাতার সন্তরা
সম্পদ আত্মসাত করে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠায়।
চ) পারিবারিক অবহেলায়।
ছ) পরিবার জনশূণ্য
বাংলাদেশের অতীথি পরায়নতা নিয়ে অনেক গল্প
পৃথিবীতে প্রসীদ্ধ। আমরা যখন ছোট ছিলাম বৃদ্ধাশ্রম শব্দটি প্রচলিত ছিল না। ইদানিং
এটা এত বেশী প্রচলিত নিজের কাছেও ভয় লাগছে। জীবনের পড়ন্ত বেলায় পিতা-মাতা অচল, জরাজীর্ণ বার্ধক্যে আক্রান্ত হয়ে চরম অসহায়ত্ব বরণ করে
পরিবার ও সন্তান থেকেও যেন
‘সন্তানহারা’ হয়ে জীবন
যাপন করছেন।
বর্তমান
সমাজে সেই
বৃদ্ধ
বাবা-মা এর জন্য সন্তানের বাসায় থাকার কোনো কক্ষ বা নিজস্ব জায়গা বরাদ্দ থাকে না। ফলে বৃদ্ধ মা-বাবার শেষ আশ্রয়স্থল হয় বৃদ্ধাশ্রমে। জনপ্রিয় গায়ক নচিকেতা বৃদ্ধাশ্রমের পুরো বিষয়টিকে চোখের সামনে তুলে ধরেছেন “বৃদ্ধাশ্রম” বাস্তবমূখী লিখা ও গায়ন ভঙ্গিতে। একশ বছর বাঁচতে চাই এখন আমার সাধ,
পঁচিশ বছর পরে খোকার হবে ঊনষাট
আশ্রমের এই ঘরটা ছোট জায়গা অনেক বেশি,
খোকা আমি দুজনেতে থাকবো পাশাপাশি,
সেই দিনটার স্বপ্ন দেখি ভীষন রকম
মূখোমূখি আমি খোকার বৃদ্ধাশ্রম।
বৃদ্ধাশ্রমে সবকিছু থাকা স্বত্বেও ভিতরে শুধু হাহাকার
পরিবারের সদস্যদের এক নযর দেখার জন্য। কেউ কেউ কাঁদতে কাঁদতে হয়ে যায় বাক
প্রতিবন্ধি আবার কারো মুখে বিলাপ জড়িত কন্ঠে প্রশ্নের আহাজারী, আমার কেউ নেই? তাদের প্রশ্নের কোন
উত্তর আল্লাহ ছাড়া আর কারো কাছে নাই । সকলের ভিতরে যেন একই অনুভূতি, ‘আমরা সন্তান হারা, পরিবার হারা, নিঃশ্ব, অসহায়’। ঝড় উঠলে সংকেত দিয়ে
জানানো হয়। কত বেগে ঝড় বইছে তা জানিয়ে দেয় আবাহাওয়া দপ্তর। কিন্তু সন্তানের কথা বা
পরিবারের কথা বা প্রিয়জনদের কথা মনে হ’লে ভিতরে যে
ঝড় বয়ে যায় তার গতিবেগ হিসাব করে বের করার সাধ্য কারো নেই, একমাত্র ভুক্তভোগী বলতে
পারেন। নজরুল লিখেছেন, ”বার্ধক্যকে যেমন বয়সের
ফ্রেমে বাঁধা যায় না।” বর্তমানে বার্ধক্য বৃদ্ধাশ্রমের ফ্রেমে বাঁধা যায়।
0 মন্তব্যসমূহ