দেনমোহর বা মোহরানা
দেনমোহর বা মোহরানা
দেনমোহর
বা মোহরানা সম্পর্কে জানতে হলে আগে জানতে হবে বিয়ে বা বিবাহ সম্পর্কে।
বিবাহ
কি?
ইসলাম ধর্মে বিয়ে হল একটি সুন্নাহ
যা হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর আদর্শ এবং ইসলামে
বিয়ে করার জন্য অত্যন্ত জোরালোভাবে পরামর্শ দেয়া হয়েছে, যা ইসলামী বিবাহের
মৌলিক বিধিবিধান অনুযায়ী সম্পন্ন করতে হয়। উপযুক্ত বয়সের পুরুষ ও নারী তাদের দাম্পত্য সম্পর্ক প্রনয়নের বৈধ আইনি
চুক্তি এবং উভয়ের স্বীকারোক্তি। পাত্র ও পাত্রী উভয় পক্ষের অভিভাবকের ইচ্ছায় এবং
পাত্র-পাত্রীর পূর্ণ সম্মতিতে অবশ্যই দুজন মুসলিম স্বাক্ষীর উপস্থিততে একটি আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া হচ্ছে বিয়ে বা বিবাহ।
আমাদের অভিভাবক অনেক সময় তাঁদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত পাত্র বা পাত্রীর উপর আরোপ করে
কিন্তু ইসলাম ধর্মে পাত্র ও পাত্রীর সম্মতির প্রাধান্য দেয়ার বিধান আছে দৃঢ়ভাবে। বৈবাহিক চুক্তিকে ইসলামে বিবাহ হিসেবে গণ্য করা হয়, যা বর
ও কনের পারষ্পারিক অধিকার ও কর্তব্যের সীমারেখা নির্ধারণ করে। হাদিস-এ আছে
অভিভাবকের সম্মতি ছাড়া কোন বিয়ে সিদ্ধ হয় না এই কথাটা রসুল করিম (সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তিনবার বলেছেন।
‘স্ত্রীরা হচ্ছে তোমাদের জন্য পোশাকস্বরূপ আর
তোমরাও তাদের জন্য পোশাকস্বরূপ।'
— সূরা
বাকারাহ-১৮৭
তোমরা তাদের অভিবাবকদের অনুমতিক্রমে তাদের
বিয়ে করো, যথাযথভাবে তাদের মোহর প্রদান করো, যেন তারা বিয়ের দুর্গে সুরক্ষিত
হয়ে থাকতে পারে এবং অবাধ যৌনচর্চা ও গোপন বন্ধুত্বে লিপ্ত হয়ে না পড়ে। — সূরা নিসা-২৫
আবু
হুরাইরা সূত্রে বর্ণিত, "যদি বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসা কোন মুসলিম যুবকের
দ্বীন এবং ব্যবহার (চরিত্র) তোমাকে সন্তুষ্ট করে তাহলে তোমার অধীনস্থ নারীর সাথে
তার বিয়ে দাও। এর অনথ্যায় হলে পৃথিবীতে ফিতনা ও দুর্নীতি ছড়িয়ে
পড়বে।” — (তিরমিযি,
মুসলিম পণ্ডিত নাসিরুদ্দিন আলবানি হাদিসটিকে হাসান বলে সাব্যস্ত করেছেন।)
দেনমোহর
কি?
মাহার” একটি আরবী শব্দ। আমাদের
দেশে যা দেনমোহর বা মোহরানা হিসাবে প্রচলিত। বিবাহ বন্ধনের প্রেক্ষিতে স্বামী তার
স্ত্রীকে যে অর্থ/সম্পদ প্রদান করে (আমাদের দেশে অনেকেই তা বাকী রাখে সারাজীবন)
তাকে মাহার বা দেনমোহর বলে। একজন মুসলমানের বিয়েতে আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক নির্দেশিত
অপরিহার্যভাবে প্রদেয় (আকদ অনুষ্ঠানের সাথে সাথে দেয়া বাঞ্চনীয়) স্বামীর পক্ষ থেকে
স্ত্রী যে অর্থ-সম্পদ পেয়ে থাকে তাকেই দেনমোহর বলে।
ইসলাম নারীকে যেসব অধিকার প্রদান
করেছে তন্মধ্যে অন্যতম একটি হলো বিবাহে দেনমোহর। এটি নারীর অগ্রিম অর্থনৈতিক নিরাপত্তা,
সংকটকালে এর মাধ্যমে সম্মানজনক জীবনযাপনের একটি সুন্দর ও অর্থবহ ব্যবস্থা। দেনমোহর
মুসলিম বিবাহিতা নারীর একচ্ছত্র অধিকার, মুসলিম বিবাহে দেনমোহর তথা মোহরানা
নির্ধারণ গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। ইসলামী আইন অনুযায়ীও দেনমোহর হলো বিয়ের অন্যতম
শর্ত। এই শর্ত অনুযায়ী বিয়ের সময় মর্যাদার প্রতীক হিসেবে স্বামী কর্তৃক স্ত্রী যে
অর্থ-সম্পদ পান বা পাওয়ার অধিকার রাখেন সেটিই দেনমোহর। স্ত্রীর প্রতি স্বামীর
সম্মান প্রদর্শনপূর্বক স্বামীকে তার স্ত্রীর মর্যাদার মূল্যায়ন হিসেবে তার ওপর
দেনমোহরের দায়িত্ব অর্পণ করেছে। দেনমোহরের মাধ্যমেই দাম্পত্যজীবনে ভালোবাসার প্রথম
বীজ বপন করা হয়। মোহরপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা স্ত্রীর মাঝে এই আত্মবিশ্বাস ও
আত্মপ্রশান্তি তৈরি করে। বিয়ের সময় স্ত্রীকে দেনমোহর প্রদান করা স্বামীর ওপর ফরজ।
ইসলামের রীতি অনুযায়ী বিবাহের শুরতেই মোহরানা পরিশোধ করতে হয়। ইসলামিক আইনে
দেনমোহরের মালিক শুধুমাত্র স্ত্রী হয়। মোহরানা হল মুসলিম বৈধ বিবাহের সনদ। একজন
স্ত্রী ইচ্ছা করলে দেনমোহর এর কোন অংশ কিংবা সমস্ত দেনমোহর মাফ করে দিতে পারেন।
তবে শর্ত থাকে যে সেটি যেন বিনা প্ররোচনায়, সরল মনে ও সুস্থ শরীরে হয়।
আল্লাহ তা’আলা বলেন –
“আর তোমাদের স্ত্রীদের তাদের
দেনমোহর দিয়ে দাও খুশি মনে। অবশ্য স্ত্রী চাইলে দেনমোহর কিছু অংশ কিংবা সম্পূর্ণ
অংশ ছেড়ে দিতে পারে। [সূরা আন-নিসাঃ৪]
বিবাহ ইচ্ছুক প্রত্যেক পুরুষের
জন্য মাহার প্রদান করা ওয়াজিব। আল্লাহ তা’আলা বলেন –
“উল্লেখিত নারীগণ ব্যতিত অন্য
নারীকে অর্থব্যয়ে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করতে চাওয়া তোমাদের জন্য বৈধ করা হল।” [সূরা
আন-নিসাঃ২৪]
মাহারের
প্রকারভেদ: মাহার
দুই প্রকার, যথাঃ- ১) নির্ধারিত বা মুসাম্মা মাহার, ২) মাহারে মিছাল
১) নির্ধারিত বা মুসাম্মা মাহারঃ
বিয়ের সময় বা বিয়ের পর উভয় পক্ষ আলাপ আলোচনার মাধ্যমে যে মাহার নির্ধারন করে তাকে
নির্ধারিত বা মুসাম্মা মাহার বলে।
২) মাহারে মিছালঃ স্ত্রীর
সমপর্যায়ের মেয়েদের মাহার তুলনা করে যে পরিমাণ মাহার স্বামী ও স্ত্রীর পক্ষ পছন্দ
করে তাকে মাহারে মিছাল বলে।
মাহারের পরিমান: এর পরিমান নির্দিষ্ট করা নাই, (তাই তো আমাদের দেশে তা ইচ্ছামত হাকায় ২০/-,
৩০/-, ৭০/-, ৮০/- লাখ এবং কোন কোন জায়গায় ১ কোটিও দেখেছি।) মোহরানা এত টাকা কেন
ধরেছে জিজ্ঞেস করলে বলে সমাজে তাদের মান সম্মান আছে না? ওটাতো নগদ দিচ্ছে না কাবিন
নামায় লিখা থাকে, কোনদিন ছাড়াছাড়ির কথা আসলে তখন এটা দরকার হয়। আর ছেলে পক্ষ একটু
চাপের মধ্যেও থাকে। আসলে সেটা কি বিয়ে হচ্ছে নাকি ধর্মের সাথে তামাশা।
কোরআন শরীফের কোন এক সুরার বঙ্গানুবাদ পড়েছি এই মুহুর্তে আমার মনে নেই তা
ছিল ঠিক এমন, “মানুষের অন্তর পরিবর্তনশীল, মুহুর্তের মধ্যে পরিবর্তন হয়”।
প্রখ্যাত নাট্যকার মুনির চৌধুরী তাঁর রক্তাক্ত প্রান্তর নাটকে লিখেছেন,
“মানুষ মরে গেলে পঁচে যায়, বেঁচে থাকলে বদলায়, কারণে অকারণে বদলায়, সকালে বিকালে
বদলায়”।
এত টাকার লোভ মানুষকি সামলাতে পারবে? তাহলে কি স্ত্রীকে ঠকানো হবে না? যা
কোরআন হাদীস মোতাবেক বাধ্যতামূলক একটা সমাধান নিয়ে এভাবে ছলচাতুরী করার কি কোন
দরকার আছে? এখন দেখি অতীতে কেমন করে মোহরানা প্রদান করে আসছিল।
নবী মুসা (আঃ) (মোজেস) যখন মিশর থেকে
মদিনায় এসে সাফুরাকে বিয়ে করেন তখন তার মোহর দেওয়ার মতো কোন যোগ্যতাই ছিল না। সে
কারনে সাফুরার পিতাকে তিনি কোন প্রকার মজুরি ছাড়াই দশ বছর সাফুরার বাবার গবাদি পশু
চারণ ও পালন করে প্রতিদান হিসাবে তার শ্রম উপহার দেন।
নবিজী
(সাঃ) দুটো খেঁজুর দিয়ে বিয়ে করেছেন।
হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সঃ) উনার
প্রত্যেক স্ত্রীকে মোহর বা মাহারানা প্রদান করেন এবং তাঁদেরকে দাস বৃত্তি থেকে
স্বাধীন করে দেন। তিনি উনার অন্যতম স্ত্রী উম্মে হাবিবাকে ৪ হাজার দিরহাম মোহর
দিয়েছিলেন। এই মোহর নির্ধারন করেছিলেন তৎকালীন আবিসিনিয়ার সম্রাট নাযাশি (আবু
দাউদ, ‘কিতাব এন নিকাহ’ ২:২৩৫)। মোহরের সর্বোচ্চ পরিমান কত হবে, তা কখনোই কোথাও
নির্ধারিত করা হয়নি। স্বামীর অর্থনৈতিক যোগ্যতা, অবস্থা ভেদে এটি নির্ধারিত হতো। এ
বিষয়ে একটি দৃষ্টান্ত মূলক ঘটনার নজীরও রয়েছে।
দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর (রাঃ) তার
ভক্ত সমাবেশে ঘোষণা দেন ,নসিহত করেন যে,‘ কেউ খুব ভারী ও বিপুল পরিমান মোহর
নির্ধারন করবেন না। কারন নবীজী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) চার’শ দিরহামের বেশি পরিমান
মোহর কাউকে দিতে বারণ করেছেন।’ তৎক্ষণাৎ এ কথার প্রতিবাদ জানান ওই সমাবেশে আগত এক
নারী। তিনি কোরাণের ৪:২০ সুরা ও আয়াতের ব্যাখ্যা তুলে ধরে বলেন,“ তুমি যদি একজনের পরিবর্তে
অন্য একজনকে স্ত্রী হিসাবে গ্রহন করো এবং যদি প্রথম স্ত্রীকে মোহরানা হিসাবে কয়েক
রাশি স্বর্নমুদ্রাও দাও, তাহলে তার একতিল পরিমানও তুমি সাবেক স্ত্রীর কাছ থেকে
ফেরত নিতে পারবে না। খলিফা ওমর সঙ্গে সঙ্গে নিজের কথাটি প্রত্যাহার করে ওই নারীর
বক্তব্যটিকে সঠিক বলে মন্তব্য করেন ‘যিনি যে পরিমান মোহর দিতে চান তিনি সে পরিমানই
দিতে পারবেন’ (ইবনে হযর আল-আথকালানি, ফাত আল-বারী, ৯:১৬৭”)।
হযরত
আলী (রাঃ) যখন হযরত মুহাম্মদ (সঃ) কন্যা ফাতেমা (রঃ) কে বিয়ে করেন। রসুলে আকরাম
(সাঃ) হজরত আলী (রাঃ)-কে নির্দেশ দিয়েছেন, বিবি নিয়ে নির্জনবাসে যাওয়ার আগেই মাহারানা
পরিশোধ করার । তখন মাহারানা দেয়ার মতো হজরত আলী (রাঃ) এর কোনো সম্পদ ছিল না, বিয়ের
সময় তাঁর মালিকানায় ছিল কেবলমাত্র উট, তরবারি আর বর্ম। উট তরবারি তাঁর জীবন যাপনের
জন্য অতি আবশ্যক ও জরুরি বলে নবীজী হযরত আলীকে (রাঃ) উট তরবারি বাদ দিয়ে বিয়েতে বর্মটি
মাহারানা হিসেবে ফাতেমাকে (রাঃ) দেয়ার নির্দেশ দেন, তা হযরত আলী (রাঃ) পালন করেন। সাধারণভাবে মাহার
কম ধার্য করাই মুস্তাহাব। রসূল(সাঃ)বলেন –
“সে নারী বরকতের মাঝে আছে যাকে
প্রস্তাব দেয়া সহজ ও যার মোহরানা অল্প” [মুসনাদু আহমাদ; হাসান সানাদে]
মাহার এর সর্বনিম্ন পরিমান
সম্পর্কে ইমাম ইবনুল কায়্যিম (রহঃ) বলেন- “কোন বস্তু, সেবা যার মূল্য আছে তাই
মাহার হিসেবে ধার্য করা যেতে পারে” যেমন- সোনা, রূপা, টাকা-পয়সা, জমি জমা, ফলমূল
ইত্যাদি। আর সেবার উদাহরণ হলঃ ভেড়া চরানো, সেচ দেয়া, ফল তোলা কুরআন শিক্ষা দেয়া
ইত্যাদি। মাহারের সর্বাধিক পরিমাণের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট কোন সীমা নেই। যা আমাদের
দেশে প্রচলিত তবে কাগজে কলমে অর্থাৎ কাবিন নামায় বাস্তবিক কি হচ্ছে সেটা এতটুকু
বয়সে দেখি নাই।
মাহার প্রদানের সময়:
প্রত্যেক স্বামীরই কর্তব্য হচ্ছে
তার আর্থিক সামর্থ্য ও স্ত্রীর মর্যাদার প্রতি লক্ষ্য রেখে উভয় পক্ষের সাথে
সামঞ্জস্যপূর্ণ কোন পরিমাণ নির্দিষ্ট করে বেঁধে দেয়া। আর মেয়ে পক্ষেরও তাতে সহজেই
রাজী হয়ে যাওয়া উচিত। পারষ্পরিক সমোঝোতার ভিত্তিতে মাহার প্রদান বিয়ের সময় বা
বিয়ের পরে উভয়ই জায়েয। এমনকি মাহারের কিছু অংশ বিবাহের সময় এবং কিছু অংশ পরবর্তীতে
প্রদান করাও জায়েয। তবে এ ক্ষেত্রেও তা পারষ্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে হতে হবে। তবে এ
ব্যাপারে স্ত্রীর উপর কোন প্রকারের চাপ প্রয়োগ করা যাবে না। দেনমোহরের বিষয়টি
হালকাভাবে নিয়ে লোক দেখানো ‘অধিক দেনমোহর’ ধার্য করাতে কোনো বরকত নেই। বরং তা
অহংকারের পরিচায়ক। দেনমোহর যে কতটা গুরুতপূর্ণ বিষয়, তা বুখারী শরীফের হাদীসই
প্রমাণ বহন করে।
সাহল ইবনে
সাদ (রাঃ) বলেন, ‘’আমি অন্যান্য লোকের সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লামের সামনে উপবিষ্ট ছিলাম’’। তখন এক মহিলা দাঁড়িয়ে বলল, হে আল্লাহর রাসূল,
আমি নিজেকে আপনার জন্য হেবা করলাম, আপনি আমাকে গ্রহণ করুন। কিন্তু রাসূল করিম
(সাঃ) কিছুই বললেন না। মহিলাটি এরূপ তিনবার বলল, কিন্তু তিনবারই রাসূল করিম (সাঃ)
চুপ থাকলেন। তখন এক সাহাবী দাঁড়িয়ে বললেন আপনি যদি গ্রহন না করেন তাহলে এই মহিলার
সাথে আমার বিয়ে দিয়ে দিন। রাসূল করিম (সাঃ) জিজ্ঞাসা করলেন তোমার নিকট কি মহিলাকে
দেনমোহর দেওয়ার মত কিছু আছে? তিনি বললেন, না। তখন রাসূল করিম (সাঃ) বললেন তোমার
বাড়ি থেকে খোঁজ করে একটি লোহার আংটি হলেও নিয়ে আসো কিন্তু তিনি তাও আনতে পারেননি।
তখন রাসূল (সাঃ) বললেন তোমার কি কোরআনের কিছু মুখস্ত আছে? তখন তিনি বললেন আমার সূরা
(নাম উচ্চরণ করে) মুখস্থ আছে। রাসূল (সাঃ) বললেন, মহিলাকে ঐ সূরাগুলো শিখিয়ে দিও,
সেটাই হলো তোমার দেনমোহর। এই হাদীস দ্বারা পরিষ্কারভাবে বুঝা যাচ্ছে যে বিয়েতে
স্ত্রীকে দেনমোহর প্রদান করা অত্যাবশ্যক।
দেনমোহর
একজন নারীর হক, যদি কোনো ব্যক্তি দেনমোহর অনাদায়ের ইচ্ছা নিয়ে বিয়ে করে তাহলে সে
ব্যাভিচারী হবে। সে বিষয়েই রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন যা
মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে। রাসূল করিম (সাঃ) বলেছেন, “যে ব্যক্তি কোনো মেয়েকে
দেনমোহর দেওয়ার ওয়াদায় বিয়ে করেছে, কিন্তু দেনমোহর দেওয়ার ইচ্ছে নেই, সে কিয়ামতের
দিন আল্লাহর নিকট ব্যাভিচারী হিসেবে দাঁড়াতে বাধ্য হবে।”- মুসনাদে আহমাদ
সূরা
নিসার ২৪ নম্বর আয়াত, “এবং নারীদের মধ্যে সধবা নারী ছাড়া সকল নারীকে তোমাদের জন্য
হালাল করা হয়েছে যে, তোমরা তোমাদের অর্থের বিনিময়ে তাদেরকে তলব করবে বিবাহ বন্ধনে
আবদ্ধ করার জন্য, অবৈধ যৌনাচারে লিপ্ত হওয়ার জন্য নয়। সুতরাং তাদের মধ্যে তোমরা
যাদেরকে ভোগ করেছ তাদেরকে তাদের নির্ধারিত মোহর দিয়ে দাও। আর নির্ধারণের পর যে
ব্যাপারে তোমরা পরস্পর সম্মত হবে তাতে তোমাদের উপর কোন অপরাধ নেই। নিশ্চয় আল্লাহ
মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়।” এই আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয়, দেনমোহর হতে হবে মূল্যবান বস্তু
বা সম্পদ।
দেনমোহরের
জন্য আমাদের সমাজে সবচেয়ে বেশি প্রচলিত পরিমান হল মোহরে ফাতেমি। মোহরে ফাতেমি বলা
হয় ঐ পরিমাণ মোহর নির্ধারণ করা, যা রাসূলুল্লাহ সাঃ-এর মেয়ে হযরত ফাতেমা রাঃ-এর
জন্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। হযরত ফাতেমা রাঃ-এর মোহর ৫০০ দিরহাম নির্ধারণ করা
হয়েছিল, ১৫৩০.৯ গ্রাম রূপা (জাওয়াহিরুল ফাতাওয়া, ৪/৩৫০)।
হযরত ওমর
(রাঃ) এর খেলাফতকালে যখন মুসলমানদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আসে- তখন সাহাবারা (রাঃ)
তাদের সন্তানদের বিয়েতে দেনমোহরে ফাতেমির চেয়ে অনেক গুণ বেশি দেনমোহর নির্ধারণ
করতে শুরু করেন। হযরত ওমর (রাঃ) দেনমোহরের ক্রমবৃদ্ধির গতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে
চেয়েছিলেন। তিনি এত বেশি পরিমান দেনমহরের পক্ষে ছিলেন না। তাই, কোনো প্রকার বিচার-বিবেচনা
ছাড়া ঢালাওভাবে সবার জন্য দেনমোহরে ফাতেমি নির্ধারণ করলে সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে-
যা ইসলাম আদৌ পছন্দ করে না। আবার মোহরে ফাতেমির চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণ দেনমোহর
পরিশোধের সামর্থ্য যদি স্বামীর থাকে তবে সেক্ষেত্রে দেনমোহরে ফাতেমিকে দেনমোহর
নির্ধারণ করার দ্বারা স্ত্রীকে ঠকানো হয় ও নারীত্বের অবমাননা করা হয়। তাই দেনমোহরে
ফাতেমিকে নয়, বরং স্বামীর সামর্থ্যরে সর্বোচ্চ পরিমাণকে দেনমোহর করা উচিৎ। অন্যসব
অধিকারের মতো স্বামীর কাছে দেনমোহর দাবি করা স্ত্রীর জন্য দোষের কিছু নয়।
দেনমোহর
পরিশোধের নিয়মঃ
ইসলামী বিধানানুযায়ী মোহরানা নতুন
স্ত্রীকে স্পর্শের পূর্বে বাধ্যতামূলক ও আদায়যোগ্য এক সম্মানী। মোহরানা নিরধারণ ও
আদায় ব্যতীত বিবাহ সিদ্ধ ও শুদ্ধ হয়না। অনেকেই মনে করেন, দেনমোহরের টাকা স্ত্রীকে
দিতে হয় শুধুমাত্র বিয়ের বিচ্ছেদ ঘটলে। এটা অজ্ঞতা ও চরম ভুল ধারণা। বিয়ে বিচ্ছেদ
না হলেও দেনমোহরের টাকা পরিশোধ করা ফরজ।
অতএব এর
যাবতীয় দিক শরীয়ত অনুযায়ী ও পরিষ্কারভাবে হওয়া উচিত এবং সে হিসেবেই তা
পরিশোধের চিন্তা-ভাবনা থাকা প্রত্যেক মুসলমান স্বামীর উচিত। আমাদের সমাজে বিয়ের
নামে যা হচ্ছে, তা অধিকাংশক্ষেত্রেই নাটকীয়তা, স্ববিরোধিতা ও ধর্মহীনতা যা ধর্মীয়
জ্ঞানের অভাবের কারণে হচ্ছে বলে আমি মনে করি। ইসলামধর্ম একজন বিবাহযোগ্যা নারীকে
এতদূর পর্যন্ত মর্যাদাবতী করেছে যে, বিবাহ করতে হলে পাত্রীকে নয় বরং পাত্রপক্ষকেই
যেতে হবে পাত্রীর বাসায় এবং বাধ্যতামূলকভাবে মোহরানা পরিশোধ সাপেক্ষে পাত্রীকে
সসম্মানেই তুলে নিয়ে আসতে হবে নিজের ঘরে। খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা পাত্রের পক্ষ
থেকেই হতে হবে যা আমাদের দেশে চিন্তা করা যায় না। তাছাড়া যেখানে আংশিক বা
সম্পূর্ণ মোহরানা পরিশোধছাড়া একজন স্বামী তার নববধুকে স্পর্শ করার কোনো অধিকারই
অর্জন করেনা, সেক্ষেত্রে আমরা সমাজে দেখি তার সম্পূর্ণ উল্টোটাই! আজকাল পাত্রীর
জন্য এত মর্যাদাপূর্ণ অধিকার স্বরূপ ফরজ মোহরানার ব্যাপারটা বিবাহ অনুষ্ঠানে
যৌতুকের মতোও গুরুত্ব পাচ্ছনা বরং লোকাচার হিসেবে কবিননামায় কাগজে লিপিবদ্ধ থাকছে
মাত্র, পরিশোধ হয় কিনা সন্দেহ।
আইন অনুযায়ী কেবলমাত্র দুইটি
পরিস্থিতিতে বিলম্বিত মোহরানা স্ত্রী দাবি করতে পারেন। একটি হচ্ছে যদি স্বামীর
মৃত্যু হয় অথবা তাদের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক ভেঙ্গ যায়। অপরটি হচ্ছে, যদি স্বামী
সালিসি পরিষদ অথবা স্ত্রীর বিনা অনুমতিতে দ্বিতীয় স্ত্রী গ্রহন করেন। দেনমোহর কেনো
স্ত্রীর ভরণপোষন নয় বা বিয়ের পর স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে প্রদত্ত কোনো উপহারও নয়।
বরং বিয়ের সময় স্বামীর কাবিননামায় প্রতিশ্রুত অর্থ যা স্বামী কোন ভাবেই উপেক্ষা
করতে পারেন না।
আমরা এই আলোচনা থেকে বুঝতে পারলাম যে দেনমোহর স্ত্রীর হক যা অবশ্যই স্বামীকে প্রদান করতে হবে এবং খুশি মনে প্রদান করতে হবে। এটা স্ত্রীর প্রতি কোন দয়া বা দান নয় বরং স্ত্রীর পাওনা এবং অধিকার। মুসলিম আইন অনুসারে একটি বিয়ে বৈধ বা শুদ্ধ হতে হলে ৫টি শর্ত পূরণ করতে হয়। মোহর প্রদান ৫টি শর্তের অন্যতম একটি শর্ত। ইসলামে দেনমোহরের গুরুত্ব অপরিসীম, বিয়েতে দেনমোহর অত্যাবশ্যকীয়, এ ছাড়া নারীর স্পর্শ বৈধ হয় না। তবে তা নির্ধারণে ভারসাম্য কাম্য, অত্যধিক দেনমোহর নির্ধারণ ভালো নয়। খুব সহজে স্বামী পরিশোধ করতে পারে এতটুকু দেনমোহর ধার্য করা উত্তম।

0 মন্তব্যসমূহ