সূরা আল আরাফ
আয়াত সংখ্যা ২০৬
১) আলিফ, লাম, মীম, সোয়াদ ৷
২) এটি তোমার প্রতি নাযিল করা একটি কিতাব৷ কাজেই তোমার
মনে যেন এর সম্পর্কে কোন সংকোচ না থাকে৷ এটি নাযিল করার উদ্দেশ্য হচ্ছে, এর মাধ্যমে তুমি
(অস্বীকারকারীদেরকে) ভয় দেখাবে এবং মুমিনদের জন্যে এটি হবে একটি স্মারক৷
৩) হে মানব সমাজ! তোমাদের রবের পক্ষ থেকে তোমাদের ওপর যা
কিছু নাযিল করা হয়েছে তার অনুসরণ করো এবং নিজেদের রবকে বাদ দিয়ে অন্য অভিভাবকদের
অনুসরণ করো না৷ কিন্তু তোমরা খুব কমই উপদেশ মেনে থাকো৷
৪) কত জনপদ আমি ধ্বংস করে দিয়েছি৷ তাদের ওপর আমার আযাব অকস্মাত
ঝাঁপিয়ে পড়েছিল রাতের বলা অথবা দিনের বেলা যখন তারা বিশ্রামরত ছিল৷
৫) আর যখন আমার আযাব তাদের ওপর আপতিত হয়েছিল তখন তাদের মুখে এ
ছাড়া আর কোন কথাই ছিল না যে, সত্যিই আমরা জালেম ছিলাম৷
৬) কাজেই যাদের কাছে আমি রসূল পাঠিয়েছি তাদেরকে অবশ্যি
জিজ্ঞাসাবাদ করবো৷ এবং রসূলকেও জিজ্ঞাসা করবো (তারা পয়গাম পৌছিয়ে দেবার
দায়িত্ব কতটুকু সম্পাদন করেছে এবং এর কি জবাব পেয়েছে)।
৭) তারপর আমি নিজেই পূর্ণ জ্ঞান সহকারে সমুদয় কার্যাবিবরণী
তাদের সামনে পেশ করবো৷ আমি তো আর সেখানে অনুপস্থিত ছিলাম না!
৮) আর ওজন হবে সেদিন যথার্থ সত্য৷
৯) যাদের পাল্লা ভারী হবে তারাই হবে সফলকাম এবং যাদের পাল্লা
হালকা হবে তারা নিজেরাই হবে নিজেদের ক্ষতি সাধনকারী৷ কারণ তারা আমার আয়াতের
সাথে জালেম সূলভ আচরণ চালিয়ে গিয়েছিল৷
১০) তোমাদেরকে আমি ক্ষমতা-ইখতিয়ার সহকারে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত
করেছি এবং তোমাদের জন্যে এখানে জীবন ধারণের উপকরণ সরবরাহ করেছি৷ কিন্তু তোমরা
খুব কমই শোকর গুজারী করে থাকো৷
১১) আমি তোমাদের সৃষ্টির সূচনা করলাম তারপর তোমাদের আকৃতি
দান করলাম অতপর ফেরেশতাদের বললাম, আদমকে সিজদা করো৷ এ নির্দেশ অনুযায়ী সবাই
সিজদা করলো৷ কিন্তু ইবলীস সিজদাকারীদের অন্তরভুক্ত হলো না৷
১২) আল্লাহ জিজ্ঞেস করলেন, “আমি যখন তোকে হুকুম দিয়েছিলাম তখন
সিজদা করতে তোকে বাধা দিয়েছিল কিসে”?সে জবাব দিলঃ “আমি তার চাইতে শ্রেষ্ঠ৷ আমাকে
আগুন থেকে সৃষ্টি করেছো এবং ওকে সৃষ্টি করেছো মাটি থেকে”৷
১৩) তিনি বললেনঃ “ঠিক আছে, তুই এখান থেকে নীচে নেমে যা৷ এখানে
অহংকার করার অধিকার তোর নেই৷ বের হয়ে যা৷ আসলে তুই এমন লোকদের অন্তরভুক্ত, যারা
নিজেরাই নিজেদেরকে লাঞ্ছিত করতে চায়”৷
১৪) সে বললঃ “আমাকে সেই দিন পর্যন্ত অবকাশ দাও যখন এদের সবাইকে
পুনর্বার ওঠানো হবে” ৷
১৫) তিনি বললেনঃ “ তোকে অবকাশ দেয়া হলো”৷
১৬) সে বললোঃ “তুমি যেমন আমাকে গোমরাহীতে নিক্ষেপ করছো
তেমনি আমি ও এখন তোমার সরল-সত্য পথে এ লোকদের জন্যে ওঁত পেতে বসে থাকবো,
১৭) সামনে-পেছনে, ডাইনে-বাঁয়ে, সবদিক থেকে এদেরকে ঘিরে ধরবো
এবং এদের অধিকাংশকে তুমি শোকর গুজার পাবে না” ৷
১৮) আল্লাহ বললেনঃ “বের হয়ে যা এখান থেকে লাঞ্ছিত ও ধিকৃত
অবস্থায়৷ নিশ্চিতভাবে জেনে রাখিস, এদের মধ্য থেকে যারাই তোর অনুসরণ করবে তাদেরকে
এবং তোকে দিয়ে আমি জাহান্নাম ভরে দেবো৷
১৯) আর হে আদম! তুমি ও তোমার স্ত্রী তোমরা দুজনাই এ জান্নাতে
থাকো৷ যেখানে যা তোমাদের ইচ্ছা হয় খাও, কিন্তু এ গাছটির কাছে যেয়ো না, অন্যথায়
তোমরা জালেমদের অন্তরভূক্ত হয়ে যাবে” ৷
২০) তারপর তাদের লজ্জাস্থান, যা তাদের পরষ্পর থেকে গোপন রাখা
হয়েছিল, তাদের সামনে উন্মুক্ত করে দেবার জন্যে শয়তান তাদেরকে কুমন্ত্রণা দিল৷ সে
তাদেরকে বললোঃ “তোমাদের রব যে, তোমাদের এ গাছটির কাছে যেতে নিষেধ করেছেন তার
পেছনে এ ছাড়া আর কোন কারণই নেই যে, পাছে তোমরা ফেরেশতা হয়ে যাও অথবা তোমরা
চিরন্তন জীবনের অধিকারী হয়ে পড়ো” ৷
২১) আর সে কসম খেয়ে তাদেরকে বললো, আমি তোমাদের যথার্থ
কল্যাণকামী।
২২) এভাবে প্রতারণা করে সে তাদের দুজনকে ধীরে ধীরে নিজের পথে
নিয়ে এলো৷ অবশেষে যখন তারা সেই গাছের ফল আস্বাদন করলো, তাদের লজ্জা স্থান
পরস্পরের সামনে খুলে গেলো এবং তারা নিজেদের শরীর ঢাকতে লাগলো জান্নাতের পাতা
দিয়ে৷ তখন তাদের রব তাদেরকে ডেকে বললোঃ “আমি কি তোমাদের এ গাছটির কাছে যেতে নিষেধ
করিনি এবং তোমাদের বলিনি যে, শয়তান তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু?”
২৩) তারা দুজন বলে উঠলোঃ “হে আমাদের রব! আমরা নিজেদের ওপর
জুলুম করেছি৷ এখন যদি তুমি আমাদের ক্ষমা না করো, এবং আমাদের প্রতি রহম না করো,
তাহলে নিসন্দেহে আমরা ধ্বংস হয়ে যাবো।”
২৪) তিনি বললেনঃ “নেমে যাও, তোমরা পরষ্পরের শত্রু এবং
তোমাদের জন্য একটি বিশেষ সময় পর্যন্ত পৃথিবীতেই রয়েছে বসবাসের জায়গা ও জীবন
যাপনের উপকরণ৷।”
২৫) আর বললেনঃ “সেখানেই তোমাদের জীবন যাপন করতে এবং সেখানেই
মরতে হবে এবং সেখান থেকেই তোমাদের সবশেষে আবার বের করে আনা হবে।”
২৬) হে বনী আদম! তোমাদের শরীরের লজ্জাস্থানগুলো ঢাকার
এবং তোমাদের দেহের সংরক্ষণ ও সৌন্দর্য বিধানের উদ্দেশ্যে আমি তোমাদের জন্য
পোশাক নাযিল করেছি। আর তাকওয়ার পোশাকই সর্বোত্তম। এই আল্লাহর নিদর্শনগুলোর
অন্যতম, সম্ভবত লোকেরা এ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করবে।
২৭) হে বনী আদম! শয়তান যেন তোমাদের আবার ঠিক তেমনিভাবে
বিভ্রান্তির মধ্যে নিক্ষেপ না করে যেমনভাবে সে তোমাদের পিতামাতাকে জান্নাত থেকে
বের করেছিল এবং তাদের লজ্জাস্থান পরস্পরের কাছে উন্মুক্ত করে দেবার জন্যে তাদেরকে
বিবস্ত্র করেছিল। সে ও তার সাথীরা তোমাদেরকে এমন জায়গা থেকে দেখে যেখান থেকে
তোমরা তাদেরকে দেখতে পাও না৷ এ শয়তানদেরকে আমি যারা ঈমান আনে না তাদের অভিভাবক
করে দিয়েছি।
২৮) তারা যখন কোন অশ্লিল কাজ করে তখন বলে, আমাদের
বাপ-দাদারদেকে আমরা এভাবেই করতে দেখেছি এবং আল্লাহই আমাদের এমনটি করার হুকুম
দিয়েছেন। তাদেরকে বলে দাও আল্লাহ কখনো নির্লজ্জতা ও বেহায়াপনার হুকুম দেন না। তোমরা
কি আল্লাহর নাম নিয়ে এমন কথা বলো যাকে তোমরা আল্লাহর কথা বলে জানো না?
২৯) হে মুহাম্মাদ! তাদেরকে বলে দাও আমার রব তো সততা ও ইনসাফের
হুকুম দিয়েছেন। তাঁর হুকুম হচ্ছে, প্রত্যেক ইবাদত নিজের লক্ষ্য ঠিক রাখো এবং
নিজের দীনকে একান্তভাবে তাঁর জন্য করে নিয়ে তাঁকেই ডাকো ৷ যেভাবে তিনি এখন
তোমাদের সৃষ্টি করেছেন ঠিক তেমনিভাবে তোমাদের আবার সৃষ্টি করা হবে।
৩০) একটি দলকে তিনি সোজা পথ দেখিয়ে দিয়েছেন কিন্তু অন্য দলটির
ওপর গোমরাহী সত্য হয়ে চেপেই বসেছে। কারণ তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে শয়তানদেরকে
নিজেদের অভিভাবকে পরিণত করেছে এবং তারা মনে করছে, আমরা সঠিক পথেই আছি।
৩১) হে বনী আদম! প্রত্যেক ইবাদাতের সময় তোমরা নিজ নিজ সুন্দর
সাজে সজ্জিত হও। আর খাও ও পান করো কিন্তু সীমা অতিক্রম করে যেয়ো না, আল্লাহ
সীমা অতিক্রমকারীদেরকে পছন্দ করেন না।
৩২) হে মুহাম্মাদ! তাদেরকে বলে দাও, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের
জন্যে যেসব সৌন্দর্য সামগ্রী সৃষ্টি করেছেন, সেগুলো কে হারাম করেছে? আর আল্লাহর
দেয়া পবিত্র জিনিসগুলো কে নিষিদ্ধ করেছে? বলো, দুনিয়ার জীবনেও এ সমস্ত
জিনিস ঈমানদাদের জন্যে, আর কিয়ামতের দিনে এগুলো তো একান্তাভাবে তাদেরই জন্যে
হবে। এভাবে যারা জ্ঞানের অধিকারী তাদের জন্যে আমার কথাগুলো আমি দ্ব্যর্থহীনভাবে
বর্ণনা করে থাকি৷
৩৩) হে মুহাম্মাদ! তাদেরকে বলে দাও, আল্লাহ যেসব জিনিস হারাম
করেছেন সেগুলো হচ্ছেঃ প্রকাশ্য ও গোপন অশ্লীলতা, গোনাহ, সত্যের বিরুদ্ধে
বাড়াবাড়ি আল্লাহর সাথে তোমাদের কাউকে শরীক করা যার স্বপক্ষে তিনি কোন সনদ
পাঠাননি এবং আল্লাহর নামে তোমাদের এমন কোন কথা বলা, যা মূলত তিনি বলেছেন বলে
তোমাদের জানা নেই।
৩৪) প্রত্যেক জাতির জন্য অবকাশের একটি সময় নির্দিষ্ট রয়েছে।
তারপর যখন কোন জাতির সময় পূর্ণ হয়ে যাবে তখন এক মুহূর্তকালের জন্যেও তাকে বিলম্বিত
বা ত্বরান্বিত করা হবে না।
৩৫) (আর সৃষ্টির সূচনাপূর্বেই আল্লাহ একথা পরিষ্কার বলে
দিয়েছেনঃ) হে বনী আদম! মনে রেখো, যদি তোমাদের কাছে তোমাদের মধ্য থেকে কোন রসূল
এসে তোমাদেরকে আমার আয়াত শুনাতে থাকে, তাহলে যে ব্যক্তি আমার নাফরমানী করা থেকে
বিরত থাকবে এবং নিজের কর্মনীতির সংশোধন করে নেবে, তার কোন ভয় এবং দুঃখের কারণ
নেই।
৩৬) আর যারা আমার আয়াতকে মিথ্যা বলবে এবং তার সাথে
বিদ্রোহত্মাক আচরণ করবে, তারাই হবে জাহান্নামের অধিবাসী, সেখানে থাকবে তারা
চিরকাল।
৩৭) একথা সুস্পষ্ট, যে ব্যক্তি ডাহা মিথ্যা কথা বানিয়ে আল্লাহর
কথা হিসেবে প্রচার করে অথবা আল্লাহর সত্য আয়াতসমূহকে মিথ্যা বলে তার চেয়ে বড় জালেম
আর কে হবে? এ ধরনের লোকেরা নিজেদের তকদীরের লিখন অনুযায়ী তাদের অংশ পেতে
থাকবে অবশেষে সেই সময় উপস্থিত হবে যখন আমার পাঠানো ফেরেশতারা তাদের প্রাণ
হরণ করার জন্যে তাদের কাছে এসে যাবে৷ সে সময় তারা (ফেরেশতারা) তাদেরকে জিজ্ঞেস
করবে, বলো এখন তোমাদের সেই মাবুদরা কোথায়, যাদেরকে তোমরা ডাকতে, আল্লাহকে বাদ
দিয়ে? তারা বলবে, সবাই আমাদের কাছ থেকে অন্তর্হিত হয়ে গেছে এবং তারা নিজেরাই
নিজেদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে যে, বাস্তবিক পক্ষেই তারা সত্য অস্বীকারকারী ছিল।
৩৮) আল্লাহ বলবেনঃ যাও, তোমরাও সেই জাহান্নামে চলে যাও,
যেখানে চলে গেছে তোমাদের পূর্বের অতিক্রান্ত জিন ও মানবগোষ্ঠী। প্রত্যেকটি দলই
নিজের পূর্ববর্তী দলের প্রতি অভিসম্পাত করতে করতে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। অবশেষে
যখন সবাই সেখানে একত্র হয়ে যাবে তখন পরবর্তী প্রত্যেকটি দল পূর্ববর্তী দলের
ব্যাপারে বলবে, হে আমাদের রব! এরাই আমাদের গোমরাহ করেছে, কাজেই এদেরকে আগুনের
দ্বিগুণ শাস্তি দাও। জওয়াবে বলা হবে, প্রত্যেকের জন্য দ্বিগুণ শাস্তিই রয়েছে
কিন্তু তোমরা জানো না।
৩৯) প্রথম দলাটি দ্বিতীয় দলকে বলবেঃ (যদি আমরা দোষী হয়ে থাকি)
তাহলে তোমরা কোন দিক দিয়ে আমাদের চাইতে শ্রেষ্ঠ ছিলে? এখন নিজেদের কৃতকর্মের ফলস্বরূপ
আযাবের স্বাদ গ্রহণ করো।
৪০) নিশ্চিতভাবে জেনে রাখো, যারা আমার আয়াতসমূহকে মিথ্যা সাব্যস্ত
করেছে এবং এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে, তাদের জন্য কখনো আকাশের দরজা খুলবে না।
তাদের জান্নাতে প্রবেশ এমনই অসম্ভব ব্যাপার যেমন সূঁচের ছিদ্রে উট প্রবেশ করানো৷
অপরাধীরা আমার কাছে এভাবেই বদলা পেয়ে থাকে।
৪১) তাদের জন্য বিছানাও হবে জাহান্নামের এবং ওপরের আচ্ছাদনও
হবে জাহান্নামের। এ প্রতিফল আমি জালেমদেরকে দিয়ে থাকি।
৪২) অন্যদিকে যারা আমার আয়াত মেনে নিয়েছে এবং সৎকাজ করেছে – আর
এ পর্যায়ে আমি কাউকে তার সামর্থের অতিরিক্ত দায়িত্ব অর্পণ করি না- তারা হচ্ছে
জান্নাতবাসী৷ সেখানে তারা থাকবে চিরকাল।
৪৩) তাদের মনে পরষ্পরের বিরুদ্ধে যা কিছু গ্লানি থাকবে তা আমি
বের করে দেবো। তাদের নিম্নদেশে ঝরণাধারা প্রবাহিত হবে এবং তারা বলবেঃ
“প্রশংসা সব আল্লাহরই জন্য, যিনি আমাদের এ পথ দেখিয়েছেন। আমরা নিজেরা পথের সন্ধান
পেতাম না যদি না আল্লাহ আমাদের পথ দেখাতেন আমাদের রবের পাঠানো রসূলগণ যথার্থ সত্য
নিয়েই এসেছিলেন।” সে সময় আওয়াজ ধ্বনিত হবেঃ “তোমাদেরকে এই যে জান্নাতের
উত্তরাধিকারী বানানো হয়েছে, এটা তোমরা লাভ করেছো সেই সমস্ত কাজের প্রতিদানে
যেগুলো তোমরা অব্যাহতভাবে করতে৷”
৪৪) তারপর জান্নাতের অধিবাসীরা জাহান্নামের অধিবাসীদেরকে ডেকে
বলবেঃ “আমাদের রব আমাদের সাথে যে সমস্ত ওয়াদা করেছিলেন তার সবগুলোকেই আমরা সঠিক
পেয়েছি, তোমাদের রব যেসব ওয়াদা করেছিলেন, তোমরাও কি সেগুলোকে সঠিক পেয়েছো?
৪৫) ”তারা জবাবে বলবেঃ “হাঁ”, তখন একজন ঘোষণাকারী তাদের মধ্য
ঘোষণা করবেঃ “আল্লাহর লানত সেই জালেমদের ওপর, যারা মানুষকে আল্লাহর পথে চলতে বাধা
দিতো এবং তাকে বাঁকা করে দিতে চাইতো আর তারা ছিল আখেরাত অস্বীকারকারী।”
৪৬) এ উভয় দলের মাঝখানে থাকবে একটি অন্তরাল৷ এর উচু স্থানে
(আ’রাফ) অপর কিছু লোক থাকবে তারা জান্নাতে প্রবেশ করেনি ঠিকই কিন্তু তারা হবে তার
প্রার্থী।
৪৭) তারা প্রত্যেককে তার লক্ষণের সাহায্যে চিনে নেবে ৷
জান্নাতবাসীদেরকে ডেকে তারা বলবেঃ “তোমাদের প্রতি শান্তি হোক! ”আর যখন তাদের
দৃষ্টি জাহান্নামবাসীদের দিকে ফিরবে, তারা বলবেঃ “হে আমাদের রব! এ জালেমের সাথে
আমাদের শামিল করো না।”
৪৮) আবার এ আরাফের লোকেরা জাহান্নামের কয়েকজন বড় বড় ব্যক্তিকে
তাদের আলামত দেখে চিনে নিয়ে ডেকে বলবেঃ “দেখলে তো তোমরা, আজ তোমাদের দলবলও
তোমাদের কোন কাজে লাগলো না। আর তোমাদের যেই সাজ-সরঞ্জামকে তোমরা অনেক বড় মনে
করতে তাও কোন উপকারে আসলো না ৷
৪৯) আর এ জান্নাতের অধিবাসীরা কি তারাই নয়, যাদের সম্পর্কে
তোমরা কসম খেয়ে বলতে, এদেরকে তো আল্লাহ তাঁর রহমত থেকে কিছুই দেবেন না? আজ
তাদেরকেই বলা হয়েছে, প্রবেশ করো জান্নাতে- তোমাদের কোন ভয়ও নেই, দুঃখও নেই।”
৫০) আর জাহান্নামবাসীরা জান্নাতবাসীদেরকে ডেকে বলবেঃ “সামান্য
একটু পানি আমাদের উপর ঢেলে দাও না। অথবা আল্লাহ তোমাদের যে রিযিক দান করেছেন তা
থেকেই কিছু ফেলে দাও না।” তারা জবাবে বলবেঃ “আল্লাহ এ দুটি জিনিসই সত্য
অস্বীকারকারীদের জন্য হারাম করেছেন,
৫১) যারা নিজেদের দীনকে খেলা ও কৌতুকের ব্যাপারে বানিয়ে
নিয়েছিল এবং দুনিয়ার জীবন যাদেরকে প্রতারণায় নিমজ্জিত করেছিল।” আল্লাহ বলেন, “আজ
আমিও তাদেরকে ঠিক তেমনিভাবে ভুলে যাবো যেভাবে তারা এ দিনটির মুখোমুখী হওয়ার কথা
ভুলে গিয়েছিল এবং আমার আয়াতসমূহ অস্বীকার করেছিল।”
৫২) আমি এদের কাছে এমন একটি কিতাব নিয়ে এসেছি যাকে পূর্ণ
জ্ঞানের ভিত্তিতে বিশদ ব্যাখ্যামূলক করেছি এবং যা ঈমানদরদের জন্য পথনির্দেশন
ও রহমতস্বরূপ
৫৩) এখন এরা কি এর পরিবর্তে এ কিতাব যে পরিমাণের খবর দিচ্ছে
তার প্রতীক্ষায় আছে? যেদিন সেই পরিনাম সামনে এসে যাবে সেদিন যারা তাকে
উপেক্ষা করেছিল তারাই বলবেঃ “যথার্থই আমাদের রবের রসূলগণ সত্য নিয়ে এসেছিলেন। এখন
কি আমরা এমন কিছু সুপারিশকারী পাবো যারা আমাদের পক্ষে সুপারিশ করবে? অথবা আমাদের
পুনরায় ফিরে যেতে দেয়া হবে, যাতে পূর্বে আমরা যা কিছু করতাম তা পরিবর্তে এখন অন্য
পদ্ধতিতে কাজ করে দেখাতে পারি?” তারা নিজেরাই নিজেদেরকে ক্ষতিগ্রস্থ করেছে
এবং যে মিথ্যা তারা রচনা করেছিল তাদের সবটুকুই আজ তাদের কাছ থেকে উদাও হয়ে গেছে।
৫৪) প্রকৃতপক্ষে আল্লাহই তোমাদের রব, যিনি আকাশ ও পৃথিবী ছয়
দিনে সৃষ্টি করেছেন। তারপর তিনি নিজের কর্তৃত্বের আসনে সমাসীন হন। তিনি রাত দিয়ে
দিনকে ঢেকে দেন তারপর রাতের পেছনে দিন দৌড়িয়ে চলে আসে। তিনি সূর্য, চন্দ্র ও
তারকারাজী সৃষ্টি করেন। সবাই তাঁর নির্দেশের আনুগত। জেনে রাখো, সৃষ্টি তারই এবং
নির্দেশও তাঁরই। আল্লাহ বড়ই বরকতের অধিকারী। তিনি সমগ্র বিশ্ব জাহানের
মালিক ও প্রতিপালক ৷
৫৫) তোমাদের রবকে ডাকো কান্নাজড়িত কণ্ঠে ও চুপে চুপে। অবশ্যি
তিনি সীমালংঘনকারীদেরকে পছন্দ করেন না।
৫৬) দুনিয়ায় সুস্থ পরিবেশ বহাল করার পর আর সেখানে বিপর্যয়
সৃষ্টি করো না। আল্লাহকেই ডাকো ভীতি ও আশা সহকারে৷ নিশ্চিতভাবেই আল্লাহর রহমত
সৎকর্মশীল লোকদের নিকবর্তী।
৫৭) আর আল্লাহই বায়ুকে নিজের অনুগ্রহের পূর্বাহ্নে
সুসংবদবাহীরূপে পাঠান ৷ তারপর যখন সে পানি ভরা মেঘ বহন করে তখন কোন মৃত ভুখণ্ডের
দিকে তাকে চালিয়ে দেন এবং সেখানে বারি বর্ষণ করে(সেই মৃত ভুখণ্ড থেকে ) নানা
প্রকার ফল উৎপাদন করেন৷ দেখো, এভাবে আমি মৃতদেরকে মৃত্যুর অবস্থা থেকে বের করে
আনি৷ হয়তো এ চাক্ষুষ পর্যবেক্ষণ থেকে তোমরা শিক্ষা লাভ করবে।
৫৮) উৎকৃষ্ট ভুমি নিজের রবের নির্দেশ প্রচুর ফসল উৎপন্ন করে
এবং নিকৃষ্ট ভুমি থেকে নিকৃষ্ট ধরনের ফসল ছাড়া আর কিছুই ফলে না। এভাবেই আমি
কৃতজ্ঞ জনগোষ্ঠির জন্য বারবার নিদর্শনসমূহ পেশ করে থাকি।
৫৯) নুহকে আমি তার সম্প্রদায়ের কাছে পাঠাই। সে বলেঃ হে আমার
স্বগোত্রীয় ভাইয়েরা! আল্লাহর ইবাদত করো, তিনি ছাড়া তোমাদের আর কোন ইলাহ নেই।
আমি তোমাদের জন্য একটি ভয়াবহ দিনের আযাবের আশংকা করছি।
৬০) তার সম্প্রদায়ের প্রধানরা জবাব দেয়ঃ আমরা তো দেখতে পাচ্ছি
তুমি সুষ্পষ্ট গোমরাহীতে লিপ্ত হয়েছো।
৬১) নূহ বলেঃ হে আমার সম্প্রদায়ের ভাইয়েরা! আমি কোন
গোমরাহীতে লিপ্ত হইনি বরং আমি রব্বুল আলামীনের রসূল।
৬২) তোমাদের কাছে আমার রবের বানী পৌঁছে দিচ্ছি। আমি তোমাদের
কল্যাণকামী। আল্লাহর পক্ষ থেকে আমি এমন সব কিছু জানি যা তোমার জান না।
৬৩) তোমরা কি এ জন্য অবাক হচ্ছো যে, তোমাদের কাছে তোমাদের
স্বীয় সম্প্রদায়েরই এক ব্যক্তির মাধ্যমে তোমাদের রবের স্মারক এসেছে, তোমাদেরকে
সতর্ক করার জন্যে যাতে তোমরা ভূল পথে চলা থেকে রক্ষা পাও এবং তোমাদের প্রতি
অনুগ্রহ করা হয়?
৬৪) কিন্তু তারা তাকে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করলো। অবশেষে আমি
তাকে ও তার সাথীদেরকে একটি নৌকায় (আরোহণ করিয়ে) রক্ষা করি এবং আমার আয়াতকে যারা মিথ্যা
বলেছিল তাদেরকে ডুবিয়ে দেই। নিসন্দেহে তারা ছিল দৃষ্টিশক্তিহীন জনগোষ্ঠি।
৬৫) আর আদ (জাতির) কাছে আমি পাঠাই তাদের ভাই হূদকে৷ সে বলেঃ
“হে আমার সম্প্রদায়ের ভাইয়েরা! তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো। তিনি ছাড়া তোমাদের আর
কোন ইলাহ নেই। এরপরও কি তোমরা ভুল পথে চলার ব্যাপারে সাবধান হবে না?”
৬৬) তার সম্প্রদায়ের প্রধানরা যারা
তার কথা মানতে অস্বীকার করছিল, তারা বললোঃ “আমরা তো তোমাকে নির্বুদ্ধিতায় লিপ্ত
মনে করি এবং আমাদের ধারণা তুমি মিথ্যুক।”
৬৭) সে বললোঃ “হে আমার সম্প্রদায়ের
লোকেরা! আমি নির্বুদ্ধিতায় লিপ্ত নই। বরং আমি রব্বুল আলামীনের রসূল,
৬৮) আমার রবের বাণী তোমাদের কাছে
পৌছাই এবং আমি তোমাদের এমন হিতাকাংখী যার ওপর ভরসা করা যেতে পারে।”
৬৯) তোমরা কি এ জন্য অবাক হচ্ছো যে,
তোমাদেরকে সতর্ক করার উদ্দেশ্যে তোমাদেরই স্বগোত্রীয় এক ব্যক্তির মাধ্যমে
তোমাদের রবের স্মারক তোমাদের কাছে এসেছে? ভুলে যেয়ো না, তোমাদের রব নূহের
সম্প্রদায়ের পর তোমাদেরকে তাদের স্থলাভিষিক্ত করেন এবং অত্যন্ত স্বাস্থ্যবান, ও
সুঠাম দেহের অধিকারী করেন। কাজেই আল্লাহর অপরিসীম শক্তির কথা স্মরণ
রাখো, আশা করা যায় তোমরা সফলকাম হবে।
৭০) তারা জবাব দিলোঃ “তুমি কি আমাদের
কাছে এ জন্য এসেছো যে, আমরা একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করবো এবং আমাদের বাপ-দাদারা
যাদের ইবাদত করে এসেছে তাদেরকে পরিহার করবো? বেশ, যদি তুমি সত্যবাদী হও,
তাহলে আমাদের যে আযাবের হুমকি দিচ্ছো, তা নিয়ে এসো।”
৭১) সে বললোঃ “তোমাদের রবের
অভিসম্পাত পড়েছে তোমাদের ওপর এবং তাঁর গযবও। তোমরা কি আমার সাথে এমন কিছু নাম
নিয়ে বিতর্ক করছো, যেগুলো তৈরী করেছো তোমরা ও তোমাদের বাপ-দাদারা এবং
যেগুলোর স্বপক্ষে আল্লাহ কোন সনদ নাযিল করেননি? ঠিক আছে, তোমরা অপেক্ষা
করো এবং আমিও তোমাদের সাথে অপেক্ষা করছি।”
৭২) অবশেষে নিজ অনুগ্রহে আমি হূদ ও
তার সাথীদেরকে উদ্ধার করি এবং আমার আয়াতকে যারা মিথ্যা বলেছিল এবং যারা ঈমান আনেনি
তাদেরকে নিশ্চিহ্ন করে দেই৷
৭৩) আর সামূদের কাছে পাঠাই তাদের
ভাই সালেহকে। সে বলেঃ হে আমার সম্প্রদায়ের ভাইয়েরা! তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো।
তিনি ছাড়া তোমাদের আর কোন ইলাহ নেই। তোমাদের কাছে তোমাদের রবের সুষ্পষ্ট
প্রমাণ এসে গেছে। আল্লাহর এ উটনীটি তোমাদের জন্য একটি নিদর্শন। কাজেই তাকে
আল্লাহর জমিতে চরে খাবার জন্যে ছেড়ে দাও। কোন অসদুদ্দেশ্যে এর গায়ে হাত দিয়ো না।
অন্যথায় একটি যন্ত্রনাদায়ক আযাব তোমাদের ওপর আপতিত হবে।
৭৪) স্মরণ করো সেই সময়ের কথা যখন
আল্লাহ আদ জাতির পর তোমাদেরকে তার স্থলাভিষিক্ত করেন এবং পৃথিবীতে তোমাদেরকে
এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত করেন যার ফলে আজ তোমরা তাদের সমতলভূমিতে বিপুলায়তন প্রাসাদ ও
তার পাহাড় কেটে বাসগৃহ নির্মাণ করছো। কাজেই তাঁর সর্বময় ক্ষমতার স্মরণ থেকে
গাফেল হয়ে যেয়ো না এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করো না।
৭৫) তার সম্প্রদায়ের স্বঘোষিত
প্রতাপশালী নেতারা দুর্বল শ্রেনীর মুমিনদেরকে বললোঃ “তোমরা কি সত্যি জানো,
সালেহ ও তার রবের প্রেরিত নবী?” তারা জবাব দিলোঃ “নিশ্চয়ই, যে বাণী সহকারে তাঁকে
পাঠানো হয়েছে আমরা তা বিশ্বাস করি।”
৭৬) ঐ শ্রেষ্ঠত্বের দাবীদাররা বললো,
“তোমরা যা বিশ্বাস কর আমরা তা অস্বীকার করি৷”
৭৭) তারপর তারা সেই উটনীটিকে মেরে
ফেললো, পূর্ণদাম্ভিকতা সহকারে নিজেদের রবের হুকুম অমান্য করলো এবং সালেহকে
বললোঃ “নিয়ে এসো সেই আযাব যার হুমকি তুমি আমাদের দিয়ে থাকো, যদি সত্যিই তুমি
নবী হয়ে থাকো।”
৭৮) অবশেষে একটি প্রলয়ংকর দুর্যোগ
তাদেরকে গ্রাস করলো এবং তারা নিজেদের ঘরের মধ্যে মুখ থুবড়ে পড়ে রইল।
৭৯) আর সালেহ একথা বলতে বলতে তাদের
জনপদ থেকে বের হয়ে গেলোঃ “হে আমার সম্প্রদায়! আমার রবের বাণী আমি তোমাদের কাছে
পৌছিয়ে দিয়েছি এবং আমি তোমাদের জন্য যথেষ্ট কল্যাণ কামনা করেছি। কিন্তু আমি কি
করবো, তোমরা তো নিজেদের হিতাকাংখীকে পসন্দই কর না।”
৮০) আর লূতকে আমি পয়গম্বর করে পাঠাই।
তারপর স্মরণ করো, যখন সে নিজের সম্প্রদায়ের লোকদেরকে বললোঃ “তোমরা কি এতই
নির্লজ্জ হয়ে গেলে যে, দুনিয়ার ইতিপূর্বে কেউ কখনো করেনি এমন অশ্লীল কাজ করে
চলেছো?
৮১) তোমরা মেয়েদের বাদ দিয়ে পুরুষদের
দ্বারা কামপ্রবৃত্তি চরিতার্থ করছো? প্রকৃতপক্ষে তোমরা একেবারেই
সীমালংঘনকারী গোষ্ঠী৷”
৮২) কিন্তু তার সম্প্রদায়ের জওয়াব এ
ছাড়া আর কিছুই ছিল না যে, “এদেরকে তোমাদের জনপদ থেকে বের করে দাও। এরা বড়ই
পবিত্রার ধ্বজাধারী হয়েছে৷”
৮৩) শেষ পর্যন্ত আমি লুতের স্ত্রীকে
ছাড়া -যে পেছনে অবস্থানকারীদের অন্তরভুক্ত ছিল তাকে ও তার পরিবারবর্গকে
উদ্ধার করে নিয়ে আসি
৮৪) এবং এ সম্প্রদায়ের ওপর বৃষ্টি
বর্ষণ করি৷ তারপর সেই অপরাধীদের কী পরিণাম হয়েছিল দেখো।
৮৫) আর মাদইয়ানবাসীদের কাছে আমি
তাদের ভাই শোআইবকে পাঠাই। সে বলেঃ “হে আমার সম্প্রদায়ের লোকেরা! আল্লাহর ইবাদত
করো, তিনি ছাড়া তোমাদের আর কোন ইলাহ নেই। তোমাদের কাছে তোমাদের রবের সুষ্পষ্ট
পথনির্দশনা এসে গেছে৷ কাজেই ওজন ও পরিমাপ পুরোপুরি দাও, লোকদের পাওনা জিনিস কম
করে দিয়ো না এবং পৃথিবী পরিশুদ্ধ হয়ে যাওয়ার পর তার মধ্যে আর বিপর্যয় সৃষ্টি করো
না। এরই মধ্যে রয়েছে তোমাদের কল্যাণ,যদি তোমরা যথার্থ মুমিন হয়ে থাকো।”
৮৬) আর লোকদেরকে ভীত সন্ত্রস্ত
করার,ঈমানদারদেরকে আল্লাহর পথে চলতে বাধা দেবার এবং সোজা পথকে বাঁকা করার জন্য
(জীবনের) প্রতিটি পথে লুটেরা হয়ে বসে থাকো না। স্মরণ করো, সেই সময়ের কথা যখন
তোমরা ছিলে স্বল্প সংখ্যক। তারপর আল্লাহ তোমাদের সংখ্যা বাড়িয়ে দেন আর বিপর্যয়
সৃষ্টিকারীরা কোন ধরনের পরিণামের সম্মুখীন হয়েছে তা একবার চোখ মেলে তাকিয়ে
দেখো।
৮৭) যে শিক্ষা সহকারে আমাকে পাঠানো
হয়েছে, তোমাদের মধ্য থেকে কোন একটি দল যদি তার প্রতি ঈমান আনে এবং অন্য একটি দল
যদি তার প্রতি ঈমান না আনে তাহলে ধৈর্যসহকারে দেখতে থাকো, যতক্ষণ না আল্লাহ
আমাদের মধ্যে ফায়সালা করে দেন৷ আর তিনিই সবচেয়ে ভাল ফায়সালাকারী।
৮৮) নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের অহংকারে
মত্ত গোত্রপতিরা তাকে বললোঃ “হে শোআইব! আমরা তোমাকে ও তোমার সাথে যারা ঈমান
এনেছে তাদেরকে আমাদের জনপদ থেকে বের করে দেবো। অন্যথায় তোমাদের ফিরে আসতে হবে
আমাদের ধর্মে৷।” শোআইব জবাব দিলোঃ “আমরা রাজি না হলেও কি আমাদের জোর করে ফিরিয়ে
আনা হবে? তোমাদের ধর্ম থেকে আল্লাহ আমাদের উদ্ধার করার পর আবার যদি আমরা তাতে
ফিরে আসি তাহলে
৮৯) আমরা আল্লাহর প্রতি মিথ্যা
আরোপকারী বিবেচিত হবো। আমাদের রব আল্লাহ যদি না চান, তাহলে আমাদের পক্ষে সে দিকে
ফিরে যাওয়া আর কোনক্রমেই সম্ভব নয়। আমাদের রবের জ্ঞান সমস্ত জিনিসকে ঘিরে আছে।
আমরা তাঁরই ওপর নির্ভর করি। হে আমাদের রব! আমাদের ও আমাদের সম্প্রদায়ের মধ্যে
যথাযথভাবে ফায়সালা করে দাও এবং তুমি সবচেয়ে উত্তম ফায়সালাকারী।”
৯০) তার সম্প্রদায়ের প্রধানরা, যারা
তার কথা মেনে নিতে অস্বীকার করেছিল, পরস্পরকে বললোঃ “যদি তোমরা শোআইবের আনুগত্য
মেনে নাও, তাহলে ধ্বংস হয়ে যাবে।”
৯১) কিন্তু সহসা একটি প্রলয়ংকারী বিপদ
তাদেরকে পাকড়াও করে এবং তারা নিজেদের ঘরের মধ্য মুখ থুবড়ে পড়ে থাকে,
৯২) যারা শোআইবকে মিথ্যা বলেছিল তারা
এমনভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় যেন সেই সব গৃহে কোনদিন তার বসবাসই করতো না। শোআইবকে
যারা মিথ্যা বলেছিল অবশেষে তারা ধ্বংস হয়ে যায়।
৯৩) আর শোআইব একথা বলতে বলতে তাদের
জনপদ থেকে বের হয়ে যায়-“হে আমাদর জাতির লোকেরা! আমি আমার রবের বাণী তোমাদের কাছে
পৌছিয়ে দিয়েছি এবং তোমাদের কল্যাণ কামনার হক আদায় করেছি। এখন আমি এমন জাতির জন্য
দুঃখ করবো কেন,যারা সত্যকে মেনে নিতে অস্বীকার করে? ”
৯৪) আমি যখনই কোন জনপদে নবী
পাঠিয়েছি, সেখানকার লোকেদেরকে প্রথমে অর্থকষ্ট ও দুঃখ -দুর্দশায় সম্মুখীন করেছি,
একথা ভেবে যে, হয়তো তারা বিনম্র হবে ও নতি স্বীকার করবে।
৯৫) তারপর তাদের দুরবস্থাকে সমৃদ্ধিতে
ভরে দিয়েছি। ফলে তারা প্রাচুর্যে পরিপূর্ণ হয়ে গেছে এবং বলতে শুরু করেছে আমাদের
পূর্বপুরুষদের ওপরও দুর্দিন ও সুদিনের আনাগোনা চলতো। অবশেষে আমি তাদেরকে সহসাই
পাকড়াও করেছি। অথচ তারা জানতেও পারেনি।
৯৬) যদি জনপদের লোকেরা ঈমান আনতো
এবং তাকওয়ার নীতি অবলম্বন করতো, তাহলে আমি তাদের জন্য আকাশ ও পৃথিবীর বরকতসমূহের
দুয়ার খুলে দিতাম। কিন্তু তারা তো প্রত্যাখ্যান করেছে। কাজেই তারা যে অসৎকাজ করে
যাচ্ছিলো তার জন্যে আমি তাদেরকে পাকড়াও করেছি।
৯৭) জনপদের লোকেরা কি এখন এ ব্যাপারে
নির্ভয় হয়ে গেছে যে, আমার শাস্তি কখনো অকস্মাত রাত্রিকালে তাদের ওপর এসে পড়বে না,
যখন তারা থাকবে নিদ্রামগ্ন?
৯৮) অথবা তারা নিশ্চিন্তে হয়ে গেছে
যে, আমাদের মজবুত হাত কখনো দিনের বেলা তাদের ওপর এসে পড়বে না, যখন তারা খেলা
ধুলায় মেতে থাকবে?
৯৯) এরা কি আল্লাহর কৌশলের ব্যাপারে
নির্ভীক হয়ে গেছে? অথচ যে সব সম্প্রায়ের ধ্বংস অবধারিত তারা ছাড়া আল্লাহর
কৌশলের ব্যাপারে আর কেউ নির্ভীক হয় না।
১০০) পৃথিবীর পূর্ববর্তী অধিবাসীদের
পর যারা তার উত্তরাধিকারী হয়, তারা কি এ বাস্তবতা থেকে ততটুকুও শেখেনি যে আমি
চাইলে তাদের অপরাধের দরুন তাদেরকে পাকড়াও করতে পারি। (কিন্তু তারা শিক্ষনীয়
বিষয়াবলীর ব্যাপারে অবজ্ঞা ও অবহেলা প্রদর্শন করে থাকে) আর আমি তাদের অন্তরে মোহর
মেরে দেই ফলে তার কিছুই শোনে না।
১০১) যেসব জাতির কাহিনী আমি তোমাদের
শুনাচ্ছি (যাদের দৃষ্টান্ত তোমাদের সামনে রয়েছে) তাদের রসূলগণ সুষ্পষ্ট প্রমাণসহ
তাদের কাছে আসে, কিন্তু যে জিনিসকে তারাএকবার মিথ্যা বলেছিল তাকে আবার মেনে নেবার
পাত্র তারা ছিল না। দেখো, এভাবে আমি সত্য অস্বীকারকারীদের দিলে মোহর মেরে দেই।
১০২) তাদের অধিকাংশের মধ্যে আমি
অংগীকার পালনের মনোভাব পাইনি। বরং অধিকাংশকেই পেয়েছি ফাসেক ও নাফরমান।
১০৩) তারপর এ জাতিগুলোর পর (যাদের
কথা ওপরে বলা হয়েছে) আমার নিদর্শনসমূহ সহকারে মূসাকে পাঠাই ফেরাউন ও তার জাতির
প্রধানদের কাছে। কিন্তু তারাও আমার নিদর্শনসমূহের ওপর জুলুম করে। ফলতঃ
এ বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের পরিণাম কি হয়েছিল একবার দেখো।
১০৪) মূসা বললোঃ “হে ফেরাউন!
আমি বিশ্বজাহানের প্রভুর নিকট থেকে প্রেরিত।
১০৫) আমার দায়িত্বই হচ্ছে, আল্লাহর নামে
সত্য ছাড়া আর কিছুই বলবো না। আমি তোমাদের রবের পক্ষ থেকে নিযুক্তির সুষ্পষ্ট
প্রমাণসহ এসেছি। কাজেই তুমি বনী ইসরাঈলকে আমার সাথে পাঠিয়ে দাও।”
১০৬) ফেরাউন বললোঃ “তুমি যদি কোন
প্রমাণ এনে থাকো এবং নিজের দাবীর ব্যাপারে সত্যবাদী হও, তাহলে তা পেশ করো।”
১০৭) মূসা নিজের লাঠিটি ছুড়ে দিল। অমনি
তা একটি জ্বলজ্যান্ত অজগরের রূপ ধারণ করলো।
১০৮) সে নিজের হাত বের করলো তৎক্ষণাত
দেখা গেলো সেটি দর্শকদের সামনে চমকাচ্ছে।
১০৯) এ দৃশ্য দেখে ফেরাউনের
সম্প্রদায়ের প্রধানরা পরষ্পরকে বললোঃ নিশ্চয়ই এ ব্যক্তি একজন অত্যন্ত দক্ষ
যাদুকর,
১১০) তোমাদেরকে তোমাদের দেশ থেকে
বে-দখল করতে চায়। এখন তোমরা কি বলবে বলো?
১১১) তখন তারা সবাই ফেরউনকে পরামর্শ
দিলো, তাকে ও তার ভাইকে অপেক্ষারত রাখুন এবং নগরে নগরে সংগ্রাহক পাঠান।
১১২) তারা প্রত্যেক সুদক্ষ যাদুকরকে
আপনার কাছে নিয়ে আসবে।
১১৩) অবশেষে যাদুকরেরা ফেরাউনের কাছে
এলো। তারা বললোঃ “যদি আমরা বিজয়ী হই, তাহলে অবশ্যি এর প্রতিদান পাবো তো?”
১১৪) ফেরাউন জবাব দিলোঃ “হাঁ তাছাড়া
তোমরা আমার দরবারের ঘনিষ্ঠ জনেও পরিণত হবে।”
১১৫) তখন তারা মূসাকে বললোঃ “তুমি
ছুড়ঁবে না, না আমরা ছুঁড়বো?”
১১৬) মূসা জবাব দিলোঃ “তোমরাই
ছোঁড়ো।” তারা যখনই নিজেদের যাদুর বাণ ছুঁড়লো তখনই তা লোকদের চোখে যাদু করলো,
মনে আতংক ছড়ালো এবং তারা বড়ই জবরদস্ত যাদু দেখালো।
১১৭) মূসাকে আমি ইংগিত করলাম, তোমর
লাঠিটা ছুঁড়ে দাও। তার লাঠি ছোঁড়ার সাথে সাথেই তা এক নিমিষেই তাদের মিথ্যা যাদু
কর্মগুলোকে গিলে ফেলতে লাগলো।
১১৮) এভাবে যা সত্য ছিল তা সত্য
প্রমাণিত হলো এবং যা কিছু তারা বানিয়ে রেখেছিল তা মিথ্যা প্রতিপন্ন হলো।
১১৯) ফেরাউন ও তার সাথীরা মোকাবিলার
ময়দানে পরাজিত হলো এবং (বিজয়ী হবার পরিবর্তে) উল্টো তারা লাঞ্ছিত হলো।
১২০) আর যাদুকরদের অবস্থা হলো এই
-যেন কোন জিনিস ভিতর থেকে তাদেরকে সিজদানত করে দিলো।
১২১) তারা বলতে লাগলোঃ “আমরা ঈমান
আনলাম বিশ্বজাহানের রবের প্রতি,
১২২) যিনি মূসা ও হারুণেরও রব।”
১২৩) ফেরাউন বললোঃ “আমার অনুমতি
দেবার আগেই তোমরা তার প্রতি ঈমান আনলে? নিশ্চয়ই এটা কোন গোপন চক্রান্ত ছিল।
তোমরা এ রাজধানীতে বসে এ চক্রান্ত এঁটেছো এর মালিকদেরকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্যে।
বেশ, এখন এর পরিণাম তোমরা জানতে পারবে।
১২৪) তোমাদের হাত-পা আমি কেটে ফেলবো
বিপরীত দিক থেকে এবং তারপর তোমাদের সবাইকে শূলে চড়িয়ে হত্যা করবো।”
১২৫) তারা জবাব দিলোঃ “সে যাই হোক
আমাদের রবের দিকেই তো আমাদের ফিরতে হবে।
১২৬) তুমি যে ব্যাপারে আমাদের ওপর
প্রতিশোধ নিতে চাচ্ছো, তা এ ছাড়া আর কিছুই নয় যে, আমাদের রবের নিদর্শসমূহ যখন
আমাদের সামনে এসেছে তখন আমরা তা মেনে নিয়েছি। হে আমাদের রব! আমাদের সবর দান করো এবং
তোমার আনুগত্য থাকা অবস্থায় আমাদের দুনিয়া থেকে উঠিয়ে নাও।”
১২৭) ফেরাউনকে তার জাতির প্রধানরা
বললোঃ “তুমি কি মূসা ও তার জাতিকে এমনিই ছেড়ে দেবে যে, তারা দেশে বিপর্যয় সৃষ্টি
করে বেড়াক এবং তোমার ও তোমার মাবুদের বন্দেগী পরিত্যাগ করুক?”ফেরউন জবাব দিলঃ
“আমি তাদের পুত্রদের হত্যা করবো এবং তাদের কন্যাদের জীবিত রাখবো। আমরা তাদের ওপর
প্রবল কর্তৃত্বের অধিকারী।”
১২৮) মূসা তার জাতিকে বললোঃ “আল্লাহর
কাছে সাহায্য চাও এবং সবর করো। এ পৃথীবী তো আল্লাহরই। তিনি নিজের বান্দাদের মধ্য
থেকে যাকে চান তাকে এর উত্তরাধিকারী করেন। আর যারা তাঁকে ভয় করে কাজ করে চুড়ান্ত
সাফল্য তাদের জন্যে নির্ধারিত।”
১২৯) তার জাতির লোকেরা বললোঃ
“তোমার আসার আগেও আমরা নির্যাতিত হয়েছি এবং এখন তোমার আসার পরও নির্যাতিত হচ্ছি।”
সে জবাব দিলঃ “শীঘ্রই তোমাদের রব তোমাদের শত্রুকে ধ্বংস করে দেবেন এবং পৃথিবীতে
তোমাদের খলীফা করবেন, তারপর তোমরা কেমন কাজ করো তা তিনি দেখবেন।”
১৩০) ফেরাউনের লোকদেরকে আমি কয়েক বছর
পর্যন্ত দুর্ভিক্ষ ও ফসলহানিতে আক্রান্ত করেছি এ উদ্দেশ্যে যে, হয়তো তাদের চেতনা
ফিরে আসবে।
১৩১) কিন্তু তাদের এমনি অবস্থা ছিল
যে, ভাল সময় এলে তারা বলতো এটা তো আমাদের প্রাপ্য। আর খারপ সময় এসে মূসা ও তার
সাথীদেরকে নিজেদের জন্য কূলক্ষুণে গণ্য করতো। অথচ তাদের কুলক্ষণ তো আল্লাহর কাছে
ছিল। কিন্তু তাদের অধিকাংশই ছিল অজ্ঞ।
১৩২) তারা মূসাকে বললোঃ আমাদের যাদু
করার জন্যে তুমি যে কোন নিদর্শনই আনো না কেন, আমরা তোমার কথা মেনে নেবো না।
১৩৩) অবশেষে আমি তাদের ওপর দুর্যোগ
পাঠালাম, পংগপাল ছেড়ে দিলাম, উকুন ছড়িয়ে দিলাম, ব্যাংগের উপদ্রব সৃষ্টি
করলাম এবং রক্ত বর্ষণ করলাম। এসব নিদর্শন আলাদা আলাদা করে দেখালাম। কিন্তু তারা
অহংকারে মেতে রইলো এবং তারা ছিল বড়ই অপরাধ প্রবণ সম্প্রদায়।
১৩৪) যখনই তাদের ওপর বিপদ আসতো তারা
বলতোঃ হে মূসা! তোমার রবের কাছে তুমি যে মর্যাদার অধিকারী তার ভিত্তিতে তুমি
আমাদের জন্য দোয়া করো। যদি এবার তুমি আমাদের ওপর থেকে ও দুর্যোগ হটিয়ে দাও,
তাহলে আমরা তোমার কথা মেনে নেবো এবং বনী ইসরাঈলকে তোমার সাথে পাঠিয়ে দেবো।
১৩৫) কিন্তু যখনই তাদের ওপর থেকে আযাব
সরিয়ে নিতাম একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অমনি, তারা সেই অংগীকার ভংগ করতো।
১৩৬) তাই আমি তাদের থেকে বদলা নিয়েছি
এবং তাদেরকে সমুদ্রে ডুবিয়ে দিয়েছি। কারণ তারা আমার নিদর্শনগুলোকে মিথ্যা বলেছিল
এবং সেগুলোর ব্যাপারে বেপরোয়া হয়ে গিয়েছিল।
১৩৭) আর তাদের জায়গায় আমি প্রতিষ্ঠিত
করেছিলাম দুর্বল ও অধোপতিত করে রাখা মানব গোষ্ঠীকে। অতপর যে ভুখণ্ডে আমি
প্রাচুর্যে ভরে দিয়েছিলাম, তার পূর্ব ও পশ্চিম অংশকে তাদেরই করতালগত করে
দিয়েছিলাম। এভাবে বনী ইসরাঈলের ব্যাপারে তোমার রবের কল্যানের প্রতিশ্রুতি পূর্ণ
হয়েছে। কারণ তারা সবর করেছিল আর ফেরাউন ও তার জাতি যা কিছু তৈরী করেছিল ও উচূ
করছিল তা সব ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে।
১৩৮) বনী ইসরাঈলকে আমি সাগর পার করে দিয়েছি।
তারপর তারা চলতে চলতে এমন একটি জাতির কাছে উপস্থিত হলো যারা নিজেদের কতিপয়
মূর্তির পূজায় লিপ্ত ছিল। বনী ইসরাঈল বলতে লাগলোঃ হে মূসা! এদের মাবূদের মত আমাদের
জন্যো একটা মাবূদ বানিয়ে দাও। মূসা বললোঃ তোমরা বড়ই অজ্ঞের মত কথা বলছো।
১৩৯) এরা যে পদ্ধতির অনুসরণ করছে তাতে
ধ্বংস হবে এবং যে কাজ এরা করেছে তা সম্পূর্ণ বাতিল।
১৪০) মূসা আরো বললোঃ আমি কি
তোমাদের জন্য আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন ইলাহ খুজবো? অথচ আল্লাহই সারা দুনিয়ার সমস্ত
জাতি গোষ্ঠির ওপর তোমাদের শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন।
১৪১) আর (আল্লাহ বলেন) সেই সময়ের কথা
স্মরণ করো যখন আমি ফেরাউনের লোকদের কবল থেকে তোমাদের মুক্তি দিয়েছিলাম, যারা
তোমাদেরকে কঠোর শাস্তি দিতো, তোমাদের ছেলেদের হত্যা করতো এবং মেয়েদের জীবিত
রাখতো আর এর মধ্যে তোমাদের রবের পক্ষ থেকে তোমাদের জন্য ছিল মহা পরীক্ষা।
১৪২) মূসাকে আমি তিরিশ রাত-দিনের জন্য
(সিনাই পর্বতের ওপর) ডাকলাম এবং পরে দশ দিন আরো বাড়িয়ে দিলাম। এভাবে তার রবের
নির্ধারিত সময় পূর্ণ চল্লিশ দিন হয়ে গেলো। যাওয়ার সময় মূসা তার ভাই হারুনকে
বললোঃ আমার অনুপস্থিতিতে তুমি আমার জাতির মধ্যে আমার প্রতিনিধিত্ব করবে, সঠিক কাজ
করতে থাকবে এবং বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের পথে চলবে না।
১৪৩) অতপর মূসা যখন আমার নির্ধারিত
সময়ে উপস্থিত হলো এবং তার রব তার সাথে কথা বললেন তখন সে আকূল আবেদন জানালো, হে
প্রভু! আমাকে দর্শনের শক্তি দাও, আমি তোমাকে দেখবো। তিনি বললেনঃ তুমি আমাকে
দেখতে পারো না। হাঁ সামনের পাহাড়ের দিকে তাকাও। সেটি যদি নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে
থাকতে পারে তাহলে অবশ্যি তুমি আমাকে দেখতে পাবে। কাজেই তার রব যখন পাহাড়ে জ্যোতি
প্রকাশ করলেন তখন তা তাকে চূর্ণ বিচূর্ণ করে দিল এবং মূসা সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ে
গেলো। সংজ্ঞা ফিরে পেয়ে মূসা বললোঃ পাক-পবিত্র তোমার সত্তা। আমি তোমার কাছে
তাওবা করছি এবং আমিই সর্বপ্রথম মুমিন।
১৪৪) বললেন হে মূসা! আমি সমস্ত
লোকদের ওপর অগ্রাধিকার দিয়ে তোমাকে নির্বাচিত করেছি যেন আমার নবুওয়াতের দায়িত্ব
পালন করতে পারো এবং আমার সাথে কথা বলতে পারো। কাজেই আমি তোমাকে যা কিছু দেই তা
নিয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো।
১৪৫) এরপর আমি মূসাকে কতকগুলো ফলকে
জীবনের সকল বিভাগ সম্পর্কে উপদেশ এবং প্রত্যেকটি দিক সম্পর্কে সুস্পষ্ট নির্দেশ
লিখে দিলাম এবং তাকে বললামঃ “এগুলো শক্ত হাতে মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরো এবং
তোমার জাতিকে এর উত্তম তাৎপর্যের অনুসরণ করার হুকুম দাও। শীঘ্রই আমি
তোমাদের দেখাবো ফাসেকদের গৃহ৷”
১৪৬) কোন প্রকার অধিকার ছাড়াই যারা
পৃথিবীতে বড়াই করে বেড়ায়, শীঘ্রই আমার নিদর্শনসমূহ থেকে আমি তাদের দৃষ্টি
ফিরিয়ে দেবো। তারা আমার যে কোন নিদর্শন দেখলেও তার প্রতি ঈমান আনবে না। তাদের
সামনে যদি সোজা পথ এসে যায় তাহলে তারা তা গ্রহণ করবেনা আর যদি বাঁকা পথ দেখতে পায়
তাহলে তারা ওপর চলতে আরম্ভ করবে। কারণ তারা আমার নিদর্শনসমূহকে মিথ্যা বলেছে এবং
সেগুলোর ব্যাপারে বেপরোয়া থেকেছে।
১৪৭) আমার নিদর্শনসমূহকে যারাই মিথ্যা
বলছে এবং আখেরাতের সাক্ষাতের কথা অস্বীকার করেছে তাদের সমস্ত কর্মকাণ্ড ব্যর্থ হয়ে
গেছে। যেমন কর্ম তেমন ফল- এ ছাড়া লোকেরা কি আর কোন প্রতিদান পেতে পারে?
১৪৮) মূসার অনুপস্থিতিতে তার
জাতির লোকেরা নিজেদের অলংকার দিয়ে বাছুরের মুর্তি তৈরী করলো৷ তার মুখ দিয়ে গরুর
মত হাম্বা রব বের হতো। তারা কি দেখতে পেতো না যে, ঐ বাছুর তাদের সাথে কথাও বলে
না আর কোন ব্যাপারে তাদের কে পথনির্দেশনাও দেয় না? কিন্তু এরপর ও তাকে মাবুদে
পরিণত করলো৷ বস্তুত তারা ছিল বড়ই জালেম।
১৪৯) তারপর যখন তাদের প্রতারণার জাল
ছিন্ন হয়ে গেলো এবং তারা দেখতে পেলো যে, আসলে তারা পথভ্রষ্ট হয়ে গেছে তখন বলতে
লাগলোঃ যদি আমাদের রব আমাদের প্রতি অনুগ্রহ না করেন এবং আমাদের ক্ষমা না করেন,
তাহলে আমরা ধ্বংস হয়ে যাবো।
১৫০) ওদিকে মূসা ফিরে এলেন তার জাতির
কাছে ক্রুদ্ধ ও ক্ষুব্ধ অবস্থায়। এসেই বললেনঃ আমার অনুপস্থিতিতে তোমরা আমার বড়ই
নিকৃষ্ট প্রতিনিধিত্ব করছো! তোমরা কি নিজেদের রবের হুকুমের অপেক্ষা করার মত
এতটুকু সবরও করতে পারলে না? সে ফলকগুলো ছুঁড়ে দিল এবং নিজের ভাইয়ের (হারুন) মাথার
চুল ধরে টেনে আনলো। হারুন বললোঃ হে আমার সহোদর! এ লোকগুলো আমাকে দুর্বল করে
ফেলেছিল এবং আমাকে হত্যা করার উপক্রম করেছিল। কাজেই তুমি শত্রুর কাছে আমাকে
হাস্যম্পদ করো না এবং আমাকে এ জালেম সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত করো না।
১৫১) তখন মূসা বললোঃ হে আমার রব!
আমাকে ও আমার ভাইকে ক্ষমা করো এবং তোমার অনুগ্রহের মধ্যে আমাদের দাখিল করে নাও,
তুমি সবচাইতে বেশী অনুগ্রহকারী৷
১৫২) (জওয়াবে বলা হলো) যারা বাছুরকে
মাবুদ বানিয়েছে তারা নিশ্চয়ই নিজেদের রবের ক্রোধের শিকার হবেই এবং দুনিয়ার জীবন
লাঞ্ছিত হবে। মিথ্যা রচনাকারীদেরকে আমি এমনি ধরনের শাস্তিই দিয়ে থাকি।
১৫৩) আর যারা খারাপ কাজ করে তারপর
তাওবা করে নেয় এবং ঈমান আনে, এ ক্ষেত্রে নিশ্চিতভাবে এ তাওবা ও ঈমানের পর তোমার
রব ক্ষমাশীল ও করুণাময়।
১৫৪) তারপর মূসার ক্রোধ প্রশমিত হলে
সে ফলকগুলি উঠিয়ে নিল। যারা নিজেদের রবকে ভয় করে তাদের জন্য ঐ সব ফলকে ছিল
পথনির্দেশ ও রহমত।
১৫৫) আর মূসা (তার সাথে) আমার
নির্ধারিত সময়ে হাযির হবার জন্যে নিজের জাতির সত্তর জন লোককে নির্বাচিত করলো। যখন
তারা একটি ভয়াবহ ভূমিকম্পে আক্রান্ত হলো তখন মূসা বললোঃ হে প্রভূ! তুমি চাইলে
আগেই এদেরকে ও আমাকে ধ্বংস করে দিতে পারতে। আমাদের মধ্য থেকে কিছু নির্বোধ লোক
যে অপরাধ করেছিল সে জন্যে কি তুমি আমাদের সবাইকে ধ্বংস করে দেবে? এটি তো ছিল
তোমার পক্ষ থেকে একটি পরীক্ষা, এর মাধ্যমে তুমি যাকে চাও পথভ্রষ্ট করো আবার যাকে
চাও হেদায়াত দান করো। তুমিই তো আমাদের অভিভাবক। কাজেই আমাদের মাফ করে দাও এবং
আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করো। ক্ষমাশীলদের মধ্যে তুমিই শ্রেষ্ঠ।
১৫৬) আর আমাদের জন্য এ দুনিয়ার কল্যাণ
লিখে দাও এবং আখেরাতেরও, আমরা তোমার দিকে ফিরেছি। জওয়াবে বলা হলোঃ শাস্তি তো
আমি যাকে চাই তাকে দিয়ে থাকি কিন্তু আমার অনুগ্রহ সব জিনিসের ওপর পরিব্যপ্ত হয়ে
আছে। কাজেই তা আমি এমন লোকদের নামে লিখবো যারা নাফরমানী থেকে দূরে থাকবে,
যাকাত দেবে এবং আমার আয়াতের প্রতি ঈমান আনবে।
১৫৭) (আজ তারাই এ রহমতের অংশীদার) যারা
এ প্রেরিত উম্মী নবীর আনুগত্য করে, যার উল্লেখ নিকট এখানে তাওরাত ও ইনজীলে
লিখিত অবস্থায় পাওয়া যায়। সে তাদের সৎকাজের আদেশ দেয়, অসৎকাজের থেকে বিরত
রাখে, তাদের জন্য পাক পবিত্র জিনিসগুলো হালাল ও নাপাক জিনিসগুলো হারাম করে
এবং তাদের ওপর থেকে এমন সব বোঝা নামিয়ে দেয়। যা তাদের ওপর চাপানো ছিল আর এমন সব
বাঁধন থেকে তাদেরকে মুক্ত করে যাতে করে আবদ্ধ ছিল। কাজেই যারা তার প্রতি ঈমান
আনে, তাকে সাহায্য সহায়তা দান করে এবং তার সাথে অবতীর্ণ আলোকে রশ্মির অনুসরণ করে
তারাই সফলতা লাভের অধিকারী।
১৫৮) হে মুহাম্মাদ! বলে দাও, হে মানব
সম্প্রদায়, আমি তোমাদের জন্য সেই আল্লাহর রসূল হিসেবে এসেছি, যিনি পৃথিবী ও আকাশ
মণ্ডলীর সার্বভৌম কর্তৃত্বের অধিকারী। তিনি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই। তিনিই জীবন দান
করেন এবং তিনি মৃত্যু ঘটান। কাজেই ঈমান আনো আল্লাহর প্রতি এবং তাঁর প্রেরিত সেই
নিরক্ষর নবীর প্রতি, যে আল্লাহ ও তাঁর বাণীর প্রতি ঈমান আনে এবং তাঁর আনুগত্য করে।
আশা করা যায়, এভাবে তোমরা সঠিক পথ পেয়ে যাবে৷
১৫৯) মূসার জাতির মধ্যে এমন একটি
দলও ছিল যারা সত্য অনুযায়ী পথ নির্দেশ দিতো এবং সত্য অনুযায়ী ইনসাফ করতো।
১৬০) আর তার জাতিকে আমি বারোটি
পরিবারে বিভক্ত করে তাদেরকে স্বতন্ত্র গোত্রের রূপ দিয়েছিলাম। আর যখন মূসার
কাছে তার জাতি পানি চাইলো তখন আমি তাকে ইঙ্গিত করলাম, অমুক পাথরে তোমরা লাঠি
দিয়ে আঘাত করো ফলে সেই পাথরটি থেকে অকস্মাত বারোটি ঝরণাধারা প্রবাহিত হলো এবং
প্রত্যকটি দল তাদের পানি গ্রহণ করার জায়গা নির্দিষ্ট করে নিল। আমি তাদের ওপর
মেঘমালার ছায়া দান করলাম এবং তাদের ওপর অবতীর্ণ করলাম মান্না ও সালওয়া -যেসব
ভাল ও পাক জিনিস তোমাদের দিয়েছি সেগুলো খাও কিন্তু এরপর তারা যা কিছু করেছে তাতে
আমার ওপর জুলুম করেনি বরং নিজেরাই নিজেদের ওপর জুলুম করেছে।
১৬১) স্মরণ করো সেই সময়ের কথা
যখন তাদেরকে বলা হয়েছিল যে, এ জনপদে গিয়ে বসবাস করো, সেখানে উৎপাদিত ফসল থেকে
নিজেদের ইচ্ছামত আহার্য করো, হিত্তাতুন,হিত্তাতুন বলতে বলতে যাও এবং শহরের দরজা
দিয়ে সিজদানত হয়ে প্রবেশ করতে থাকো। তাহলে আমি তোমাদের গুনাহ মাফ করে দেবো এবং
সৎকর্মপরায়ণদেরকে অতিরিক্ত অনুগ্রহ দান করবো।
১৬২) কিন্তু তাদের মধ্যে যারা জালেম
ছিল তারা তাদেরকে যে কথা বলা হয়েছিল তা পরিবর্তিত করে ফেললো। এর ফলে তাদের
জুলুমের বদলায় আমি আকাশ থেকে তাদের প্রতি আযাব পাঠিয়ে দিলাম।
১৬৩) আর সমুদ্রের তীরে যে জনপদটি
অবস্থিত ছিল তার অবস্থা সম্পর্কেও তাদেরকে একটু জিজ্ঞেস করো। তাদের সেই
ঘটনার কথা স্মরণ করিয়ে দাও যে, সেখানকার লোকেরা শনিবারে আল্লাহর হুকুম অমান্য
করতো এবং শনিবারেই মাছেরা পানিতে ভেসে ভেসে তাদের সামনে আসতো অথচ শনিবার ছাড়া অন্য
দিন আসতো না। তাদের নাফরমানীর কারণে তাদেরকে আমি ক্রমাগত পরীক্ষার মধ্যে ঠেলে
দিচ্ছিলাম বলেই এমনটি হতো।
১৬৪) আর তাদের একথাও স্মরণ করিয়ে দাও,
যখন তাদের একটি দল অন্য দলকে বলেছিল, তোমরা এমন লোকদের উপদেশ দিচ্ছো কেন
যাদেরকে আল্লাহ ধ্বংস করবেন বা কঠোর শাস্তি দেবেন? জবাবে তারা বলেছিল, এসব কিছু এ
জন্যেই করছি যেন আমরা তোমাদের রবের সামনে নিজেদের ওপর পেশ করতে পারি এবং এ আশায়
করছি যে, হয়তো এ লোকেরা তাঁর নাফরমানী করা ছেড়ে দেবে।
১৬৫) শেষ পর্যন্ত তাদেরকে যে সমস্ত
হেদায়াত স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়েছিল তারা যখন সেগুলো সম্পূর্ণ ভুলে গেলো তখন যারা
খারাপ কাজে বাধা দিতো তাদেরকে আমি বাঁচিয়ে নিলাম এবং বাকি লোক যারা দোষী ছিল
তাদের নাফরমানীর জন্য তাদেরকে কঠিন শাস্তি দিলাম।
১৬৬) তারপর যে কাজ থেকে তাদেরকে বাধা
দেয়া হয়েছিল তাই যখন তারা পূর্ণ ঔদ্ধত্যসহকারে করে যেতে লাগলো তখন আমি বললাম,
তোমরা লাঞ্ছিত ও ঘৃণিত বানর হয়ে যাও।
১৬৭) আর স্মরণ করো যখন তোমাদের রব
ঘোষণা করেন কিয়ামত পর্যন্ত তিনি সবসময় বনী ইসরাঈলীদের ওপর এমন সব লোককে
চাপিয়ে দিয়ে যেতে থাকবেন যারা তাদেরকে দেবে কঠিনতম শাস্তি। নিসন্দেহে তোমাদের
রব দ্রুত শাস্তিদানকারী এবং নিশ্চিতভাবেই তিনি ক্ষমাশীল ও করুনাময়ও।
১৬৮) আমি তাদেরকে পৃথিবীতে খন্ড
বিখন্ড করে বহু সংখ্যক জাতিতে বিভক্ত করে দিয়েছি। তাদের মধ্যে কিছু লোক ছিল সৎ
এবং কিছু লোক অন্য রকম আর আমি ভাল ও খারাপ অবস্থায় নিক্ষেপ করার মাধ্যমে তাদেরকে
পরীক্ষা করতে থাকি, হয়তো তারা ফিরে আসবে।
১৬৯) তারপর পরবর্তী বংশদরদের পর এমন
কিছু অযোগ্য লোক তাদের স্থলাভিষিক্ত হয় যারা আল্লাহর কিতাবের উত্তরাধিকারী হয়ে এ
তুচ্ছ দুনিয়ার স্বার্থ আহরণে লিপ্ত হয় এবং বলতে থাকে আশা করা যায়, আমাদের ক্ষমা
করা হবে। পরক্ষনেই সেই ধরনের পার্থিব সামগ্রী যদি আবার তাদের সামনে এসে যায় তাহলে
তৎক্ষনাৎ দৌড়ে গিয়ে তা লুফে নেয়। তাদের কাছ থেকে কি কিতাবের অংগীকার নেয়া হয়নি যে,
তারা আল্লাহর নামে কেবলমাত্র সত্য ছাড়া আর কিছুই বলবে না? আর কিতাবে যা লেখা আছে
তাতো তারা নিজেরাই পড়ে নিয়েছে। আখারাতের আবাস তো আল্লাহর ভয়ে ভীত লোকদেরই জন্য
ভাল -এতটুকু কথাও কি তোমরা বুঝো না?
১৭০) যারা কিতাবের বিধান যথাযথভাবে
মেনে চলে এবং নামায কায়েম করে, নিসন্দেহে এহেন সৎকর্মশীল লোকেদের কর্মফল আমি নষ্ট
করবো না।
১৭১) তাদের কি সেই সময়টার কথা কিছু
মনে আছে যখন আমি পাহাড়কে হেলিয়ে তাদের ওপর ছাতার মত এমনভাবে বিস্তৃত করে
দিয়েছিলাম, যে তারা ধারণা করেছিল, তা বুঝি তাদের ওপর পতিত হবে? সে সময় আমি তাদেরকে
বলেছিলাম, তোমাদেরকে আমি যে কিতাব দিচ্ছি তাকে মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরো এবং তাতে যা
কিছু লেখা আছে তা স্মরণ রাখো, আশা করা যায়, তোমরা ভূল পথ অবলম্বন করা থেকে বাঁচতে
পারবে।
১৭২) আর হে নবী! লোকদের স্মরণ
করিয়ে দাও সেই সময়ের কথা যখন তোমাদের রব বনী আদমের পৃষ্ঠদেশ থেকে তাদের বংশধরদের
বের করিয়েছিলেন এবং তাদেরকে তাদের নিজেদের ওপর সাক্ষী বানিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেনঃ
আমি কি তোমাদের রব নই? তারা বলেছিলঃ নিশ্চয়ই তুমি আমাদের রব, আমরা এর সাক্ষ
দিচ্ছি। এটা আমি এ জন্য করেছিলাম যাতে কিয়ামতের দিন তোমরা না বলে বসো, আমরা
তো একথা জানতাম না।
১৭৩) অথবা না বলে ওঠো, শিরকের সূচনা
তো আমাদের বাপ-দাদারা আমাদের পূর্বেই করেছিলেন এবং পরবর্তীকালে তাদের বংশে আমাদের
জন্ম হয়েছে। তবে কি ভ্রষ্টাচারী লোকেরা যে অপরাধ করেছিল সে জন্য তুমি আমাদের
পাকড়াও করছো?
১৭৪) দেখো, এভাবে আমি নিদর্শনসমূহ
সুষ্পষ্টভাবে পেশ করে থাকি আর এ জন্য করে থাকি যাতে তারা ফিরে আসে।
১৭৫) আর হে মুহাম্মাদ! এদের সামনে সেই
ব্যক্তির অবস্থা বর্ণনা করো যাকে আমি দান করেছিলাম আমার আয়াতের জ্ঞান। কিন্তু
সে তা যথাযথভাবে মেনে চলা থেকে দূরে সরে যায়। অবশেষে শয়তান তার পিছনে লাগে। শেষ
পর্যন্ত সে বিপথগামীদের অন্তরর্ভূক্ত হয়েই যায়।
১৭৬) আমি চাইলে ঐ আয়াতগুলোর সাহায্যে
তাকে উচ্চ মর্যাদ দান করতাম কিন্তু সে তো দুনিয়ার প্রতিই ঝুঁকে রইল এবং নিজের
প্রবৃত্তির অনুসরণ করলো। কাজেই তা অবস্থা হয়ে গেল কুকুরের মত, তার ওপর আক্রমণ
করলেও সে জিভ ঝুলিয়ে রাখে আর আক্রমণ না করলেও জিভ ঝুলিয়ে রাখে৷ যারা আমার
আয়াতকে মিথ্যা সাব্যস্ত করে তাদের দৃষ্টান্ত এটাই। তুমি এ কাহিনী তাদেরকে শুনাতে
থাকো, হয়তো তারা কিছু চিন্তা-ভাবনা করবে।
১৭৭) যারা আমার আয়াতকে মিথ্যা বলেছে
তাদের দৃষ্টান্ত বড়ই খারাপ এবং তার নিজেরাই নিজেদের প্রতি জুলুম চালিয়ে গেছে৷
১৭৮) আল্লাহ যাকে সুপথ দেখান সে-ই
সঠীক পথ পেয়ে যায় এবং যাকে আল্লাহ নিজের পথনির্দশনা থেকে বঞ্চিত করেন সে-ই ব্যর্থ
ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে।
১৭৯) আর এটি একটি অকাট্য সত্য যে, বহু
জিন ও মানুষ এমন আছে যাদেরকে আমি জাহান্নামের জন্যই সৃষ্টি করেছি। তাদের হৃদয়
আছে কিন্তু তা দিয়ে তারা উপলব্ধি করে না। তাদের চোখ আছে কিন্তু তা দিয়ে তারা দেখে
না। তাদের কান আছে কিন্তু তা দিয়ে তারা শোনে না। তারা পশুর মত বরং তাদের চাইতেও
অধম। তারা চরম গাফলতির মধ্যে হারিয়ে গেছে।
১৮০) সুন্দর নামগুলো আল্লাহর
জন্য নির্ধারিত সুতরাং সুন্দর নামেই তাঁকে ডাকো এবং তাঁর নাম রাখার ব্যাপারে যারা
সত্য থেকে বিচ্যুত হয়ে যায় তাদেরকে বর্জন কর। তারা যা কিছু করে এসেছে তার ফল
অবশ্যি পাবে।
১৮১) আমার সৃষ্টির মধ্যে একটি দল এমনও
আছে যে, যথার্থ সত্য অনুযায়ী পথনির্দেশ দেয় এবং সত্য অনুযায়ী বিচার করে৷
১৮২) আর যারা আমার আয়াতসমূহকে মিথ্যা
বলেছে তাদেরকে আমি এমন পদ্ধতিতে পর্যায়ক্রমে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাবো যে, তারা
জানতেও পারবে না।
১৮৩) আমি তাদেরকে ঢিল দিচ্ছি। আমার
কৌশল অব্যর্থ।
১৮৪) তারা কি কখনো চিন্তা করে না,
তাদের সাথীর ওপর উন্মাদনার কোন প্রভাব নেই? সে তো একজন সতর্ককারী মাত্র, (অশুভ
পরিণতির উদ্ভব হবার আগেই) সুষ্পষ্টভাবে সতর্ক করে দিচ্ছি।
১৮৫) তারা কি কখনো আকাশ ও পৃথিবীর
ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে চিন্তা করেনি এবং আল্লাহর সৃষ্ট কোন জিনিসের দিকে চোখ মেলে
তাকায়নি? আর তারা কি এটাও ভেবে দেখেনি যে, সম্ভবত তাদের জীবনের অবকাশেকাল পূর্ণ
হবার সময় ঘনিয়ে এসেছে?
১৮৬) তাহলে নবীর এ সতর্কীকরণের পর আর
এমন কি কথা থাকতে পারে যার প্রতি তারা ঈমান আনবে? আল্লাহ যাকে পথনির্দশনা থেকে বঞ্চিত
করেন তার জন্যে আর কোন পথ নির্দেশক নেই। আর আল্লাহ তাদেরকে তাদের অবাধ্যতার মধ্যে
উদভ্রান্তের মত ঘুরে বেড়াবার জন্যে ছেড়ে দেন।
১৮৭) তারা তোমাকে জিজ্ঞেস করছে,
কিয়ামত কবে ও কখন হবে? বলে দাও, একমাত্র আমার রবই এর জ্ঞান রাখেন। সঠিক সময়ে তিনিই
তা প্রকাশ করবেন। আকাশ ও পৃথিবীতে তা হবে ভয়ংকর কঠিন সময়। সহসাই তা তোমাদের ওপর
এসে পড়বে। তারা তোমার কাছে এ ব্যাপারে এমনভাবে জিজ্ঞেস করছে যেন তুমি তার সন্ধানে
ঘুরে বেড়াচ্ছ? বলে দাও, একমাত্র আল্লাহরই এর জ্ঞান রাখেন কিন্তু অধিকাংশ লোক এ
সত্যটি জানে না।
১৮৮) হে মুহাম্মাদ! তাদেরকে বলো, নিজের
জন্য লাভ-ক্ষতির কোন ইখতিয়ার আমার নেই। একমাত্র আল্লাহই যা কিছু চান তাই হয়। আর
যদি আমি গায়েবের খবর জানতাম, তাহলে নিজের জন্যে অনেক ফায়দা হাসিল করতে পারতাম এবং
কখনো আমার কোন ক্ষতি হতো না। আমি তো যারা আমার কথা মেনে নেয় তাদের জন্য নিছক
একজন সতর্ককারী ও সুসংবাদদাতা মাত্র।
১৮৯) আল্লাহই তোমাদের সৃষ্টি করেছেন
একটি মাত্র প্রাণ থেকে এবং তারই প্রজাতি থেকে তার জুড়ি বানিয়েছেন, যাতে করে তার
কাছে প্রশান্তি লাভ করতে পারে। তারপর যখন পুরুষ নারীকে ঢেকে ফেলে তখন সে হালকা
গর্ভধারণ করে। তাকে বহন করে সে চলাফেরা করে। গর্ভ যখন ভারি হয়ে যায় তখন তারা দুজনে
মিলে এক সাথে তাদের রব আল্লাহর কাছে দোয়া করে যদি তুমি আমাদের একটি ভাল সন্তান
দাও তাহলে আমরা তোমার শোকরগুজারী করবো।
১৯০) কিন্তু যখন আল্লাহ তাদেরকে একটি
সুস্থ-নিখুঁত সন্তান দান করেন, তখন তারা তাঁর এ দান ও অনুগ্রহে অন্যদেরকে তাঁর
সাথে শরীক করতে থাকে। তারা যেসব মুশরিকী কথাবার্তা বলে আল্লাহ তার অনেক উর্ধে।
১৯১) কি ধরনের নির্বোধ লোক এরা!
আল্লাহর শরীক গণ্য করে তাদেরকে, যা কোন জিনিস সৃষ্টি করেনি বরং নিজেরাই সৃষ্ট।
১৯২) যারা তাদেরকে সাহায্য করতে পারে
না এবং নিজেরাও নিজেদেরকে সাহায্য করার ক্ষমতা রাখে না।
১৯৩) যদি তোমরা তাদেরকে সত্য-সরল পথে
আসার দাওয়াত দাও তাহলে তারা তোমাদের পেছনে আসবে না, তোমরা তাদেরকে ডাকো বা চুপ
করে থাকো উভয় অবস্থায়ই ফল তোমাদের জন্য সমানই থাকবে।
১৯৪) তোমরা আল্লাহকে বাদ দিয়ে
যাদেরকে ডাকো তারা তো তোমাদের মতই বান্দা। তাদের কাছে দোয়া চেয়ে দেখো, তাদের
সম্পর্কে তোমাদের ধারণা যদি সত্য হয়ে থাকে, তবে তারা তোমাদের দোয়ায় সাড়া দিক।
তাদের কি পা আছে, যা দিয়ে তারা চলতে পারে?
১৯৫) তাদের কি হাত আছে যা দিয়ে তারা
ধরতে পারে? তাদের কি চোখ আছে যা সাহায্যে তারা দেখতে পারে? তাদের কি কান আছে যা
দিয়ে তারা শুনতে পারে? হে মুহাম্মাদ! এদেরকে বলো, তোমাদের বানানো
শরীকদেরকে ডেকে নাও তারপর তোমরা সবাই মিলে আমার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করো এবং আমাকে
একদম অবকাশ দিয়ো না।
১৯৬) আমার সহায় ও সাহায্যকারী সেই
আল্লাহ যিনি কিতাব নাযিল করেছেন এবং তিনি সৎ লোকদের সহায়তা করে থাকেন।
১৯৭) অন্যদিকে তোমরা আল্লাহকে বাদ
দিয়ে যাদেরকে ডেকে থাকো তারা তোমাদের ও সাহায্য করতে পারে না এবং নিজেরাও নিজেদের
সাহায্য করার ক্ষমতা রাখে না।
১৯৮) বরং তোমরা যদি তাদেরকে
সত্য-সঠিক পথে আসতে বলো তাহলে তারা তোমাদের কথা শুনতেও পাবে না। বাহ্যত তোমরা
দেখছো, তারা তোমাদের দিকে তাকিয়ে আছে কিন্তু আসলে তারা কিছুই দেখছে না।
১৯৯) হে নবী! কোমলতা ও ক্ষমার পথ
অবলম্বন করো। সৎকাজের উপদেশ দিতে থাকো এবং মূর্খদের সাথে বিতর্কে জড়িও না।
২০০) যদি কখনো শয়তান তোমাকে
উত্তেজিত করে তাহলে আল্লাহর আশ্রয় চাও। তিনি সবকিছু শোনেন এবং জানেন।
২০১) প্রকৃতপক্ষে যারা মুক্তাকী,
তাদেরকে যদি কখনো শয়তানের প্রভাবে অসৎ চিন্তা স্পর্শও করে যায় তাহলে তারা তখনই সতর্ক
হয়ে উঠে তারপর তারা নিজেদের সঠিক কর্মপদ্ধতি পরিষ্কার দেখতে পায়।
২০২) আর তাদের অর্থাৎ (শয়তানের)
ভাই-বন্ধুরা তো তাদেরকে তাদের বাঁকা পথেই টেনে নিয়ে যেতে থাকে এবং তাদেরকে
বিভ্রান্ত করার ব্যাপারে তারা কোন ত্রুটি করে না।
২০৩) হে নবী! যখন তুমি তাদের সামনে কোন
নিদর্শন (অর্থাৎ মুজিযা) পেশ করো না তখন তারা বলে, তুমি নিজের জন্য কোন নিদর্শন
বেছে নাওনি কেন? তাদেরকে বলে দাও, আমি তো কেবল সেই অহীরই আনুগত্য করি যা
আমার রব আমার কাছে পাঠান। এটি তো অন্তরদৃষ্টির আলো তোমাদের রবের পক্ষ থেকে এবং
হেদায়াত ও রহমত তাদের জন্য যারা একে গ্রহণ করে।
২০৪) যখন কুরআন, তোমাদের সামনে পড়া
হয়, তা শোনো মনোযোগ সহকারে এবং নীরব থাকো, হয়তো তোমাদের প্রতিও রহমত বর্ষিত
হবে।
২০৫) হে নবী! তোমার রবকে স্মারণ করো
সকাল-সাঁঝে মনে মনে কান্নাজড়িত স্বরে ও ভীতি বিহ্বল চিত্তে এবং অনুচ্চ কণ্ঠে৷ তুমি
তাদের অন্তরভুক্ত হয়ো না যারা গাফলতির মধ্যে ডুবে আছে।
২০৬) তোমার রবের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে
অবস্থানকারী ফেরেশতাগণ কখনো নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের অহংকারে তাঁর ইবাদতে বিরত হয়
না, বরঞ্চ তারা তাঁরই মহিমা ঘোষণা করে এবং তাঁর সামনে বিনত থাকে ৷
0 মন্তব্যসমূহ