Ad Code

Responsive Advertisement

ইনকা সভ্যতা

 

ইনকা সভ্যতা

প্রাক-কলম্বীয় যুগে দক্ষিণ আমেরিকা সবচেয়ে বৃহত্তম সাম্রাজ্য ছিল ইনকা সাম্রাজ্য। ইনকারা কোথা থেকে এসেছিল তা নিয়ে ব্যাপক ধোঁয়াশা রয়েছে। প্রাচীন পৃথিবীর অনেক রহস্যই এখনো মানুষের কাছে উন্মোচিত হয়নি। এমনই এক রহস্যময় সভ্যতা হচ্ছে ইনকা সভ্যতা। বর্তমান পেরুর কুজকো এলাকায় সুপ্রাচীন ইনকা সভ্যতার যাত্রা শুরু হয়েছিল একটি উপজাতি হিসেবে। ইকুয়েডর, পেরু, বলিভিয়া, উত্তর পশ্চিম আর্জেন্টিনা, উত্তর চিলি ও দক্ষিণ কলম্বিয়া ইনকা সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে তারা নিজেদের সূর্যের সন্তান বলেই দাবী করতো। মুলত ১২০০ শতাব্দীতে বর্তমান পেরুর কুজকো শহরেই ইনকাদের বসতি স্থাপন হয়েছিল। মাত্র ১০০ বছরের মধ্যেই বিশাল এক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিল ইনকারা। ইনকা বেশ সুপ্রতিষ্ঠিত আর বেশ সমৃদ্ধ এক সাম্রাজ্য ছিল। ইনকারা সূর্য দেবতা ইন্তির অনুসারী ছিল। আর তাদেরকে রাজাকে ‘সাপা ইনকা’ বলে অভিহিত করা হতো; যার অর্থ সূর্যের সন্তান।  সাপাগণ ছিলেন সূর্যদেবতা ইন্তির প্রতিনিধি। তবে এই সাপাদের হাতে কোনো সার্বভৌম ক্ষমতা ছিলো না। সময়কাল ছিল ১৪৩৮ থেকে ১৫৩২ খ্রিস্টাব্দ। 


ইনকাদের শাসনামলে রাজ্য থেকে সুন্দর ও স্বাস্থ্যবান শিশুরা রহস্যজনকভাবে উধাও হয়ে যেতো। কেবল নির্বাচিত শিশুরাই নিখোঁজ হতো। তাদের কোথাও খুঁজে পাওয়া যেত না। আসলে এসব শিশুরা হারিয়ে যেত না, এদের সরিয়ে ফেলা হতো। এ বিষয়টা ইনকাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের অংশ ছিল। যে শিশুদের হারিয়ে যেতে দেয়া হতো তাদের দর্শনীয়, স্বাস্থ্যবান ও যথেষ্ট বুদ্ধিমান হতে হতো। দেব-দেবীর সন্তুষ্টির জন্য তারা ‘কাপাকোচা’ নামের বিশেষ অনুষ্ঠানে শিশুদের বলি দিত। দেব-দেবীর উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করার পূর্বে ইনকারা কিভাবে তাদের শিশুদের মোটাতাজা করতো, তার জ্বলন্ত প্রমাণ পাওয়া গেছে কিছু মমি আবিষ্কারের ফলে। এছাড়া ইনকাদের অদ্ভুত সব রীতি-নীতি ও চাল-চলনের কথা শোনা যায়। ইনকারা তিনটি জগতের উপর বিশ্বাস করতো। উচ্চ জগত, মধ্য জগত ও নিম্ন জগত। উচ্চ জগত হলো স্বর্গ, যেখানে পূণ্যবান ও রাজারা মৃত্যুর পর যাবে। সেখানে রয়েছে অসীম সুখ। মধ্য জগত হলো পৃথিবী, যেখানের কর্ম অনুযায়ী মৃত্যুর পর ফল পাওয়া যাবে। নিম্ন জগত হলো নরক, যেখানে মৃত্যুর পর পাপীরা ফল ভোগ করবে।


দক্ষিণ আমেরিকার পেরুর আন্দিজ পর্বতমালায় ১২ শতকে যে সভ্যতা গড়ে উঠেছিল তা ইনকা সভ্যতা নামে পরিচিত। ইনকা শব্দের অর্থ সূর্যের সন্তান। সাধারণত কুজকো অঞ্চলের শাসকদের ইনকা বলা হতো। কখনো কখনো সমুদয় জনগোষ্ঠীকেও ইনকা বলা হতো। ইনকার রাষ্ট্রীয় ভাষার নাম কুয়েচাওয়া। এর বাইরেও সাম্রাজ্য জুড়ে অন্তত ২০ টি স্থানীয় ভাষার অস্তিত্ব ছিল। ইনকারা অত্যন্ত সামাজিক ছিল। এই কারণে এরা সামাজিক রীতিনীতিকে অত্যন্ত প্রাধান্য দিত। রাজা নিজের বোনকে বিবাহ করলেও, সাধারণ ইনকাদের ভিতরে এই জাতীয় কোনো বিধি ছিল না। এরা আপন বোন ছাড়াও অন্য যে কোনো কন্যাকে বিবাহ করতে পারতো। এক্ষেত্রে ইনকা ছেলেদেরকে ২০ বৎসর বয়সের আগে কন্যা পছন্দ করতে হতো। কোনো ছেলে কনে খুঁজে না পেলে, অভিভাবকরা কনে খুজে দিত। অনেক সময় কোনো কোনো অভিভাবক তার পুত্র সন্তানের জন্য কন্যা পছন্দ করে রাখতো। কন্যার অভিভাবকরা তাতে রাজি হলে, ওই কন্যা বাগদত্তা হিসেবে অন্য কারো সাথে বিবাহ করতে পারতো না। বিবাহের দিন বর-কনে পরস্পরের হাত ধরে চন্দন বিনিময় করতো। এরপর বিবাহ উপলক্ষে সামাজিক ভোজ হতো। কিন্তু রাজ্যের সুন্দরী মেয়েদের অনেক সময় রাজার উপপত্নী করার জন্য পাঠানো হতো। এ বিষয়ে স্থানীয় পুরোহিত এবং সেনাশাসকদের বিশেষ ভূমিকা থাকতো।

ইনকাদের পোশাক ছিল পশুর চামড়া। আমেরিকার গ্রীষ্মপ্রধান এলাকায় প্রবেশ করার পর এরা হালকা পোশাকের জন্য সূতিবস্ত্র তৈরি করা শেখে। পেরু অঞ্চলে প্রবেশ করার পর, এরা লামার পশম দিয়ে পোশাক বানানো আয়ত্ব করে। ইনকাদের নির্মাণশৈলী খুবই নিখুঁত এবং সাদামাঠা। বাধানো রাস্তার ব্যবহার তারা শুরু করেছিলো। দেয়াল নির্মাণ, ইনকারা মুদ্রা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনে। কৃষিতে ইনকারা অনেক অনেক উন্নতি করেছিলো এবং খাদ্য প্রস্তুত এবং সংরক্ষণীয় বিদ্যায় পারদর্শী ছিলো। মিসরীয় ফিরাউনদের মতো তাদের সম্রাটরাও ডেমিগড মর্যাদার অধিকারী ছিল। ১৯১১ সালে হায়ারাযাম বিংগাম তার ব্যক্তিগত ভ্রমণ অনুসন্ধিৎসা থেকে চলতে চলতে মাচুপিচু দুর্গনগরী, ইনকাদের শেষ আশ্চর্য নিদর্শন আবিষ্কার করেন।

সাম্রাজ্য যখন খুব বড় হয়ে যায় তখন তা নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে যায়। এ যুগে উওরাধিকার নির্বাচনের কোনো নির্দিষ্ট নিয়মছিল না। একারণে সিংহাসনের দাবিদারদের মধ্যে দ্বন্ধ লেগেই থাকত। নিজেদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষও হত। হুয়াইনা কাপাক এর সময় ইনকাদের গৃহযুদ্ধ হয়েছিল। এ দ্বন্ধ- সংঘাতের সুযোগ নিয়েছিলো স্পেনীয়রা। ১৫৩২ সালে স্পেনীয় বিজেতা ফ্রান্সিসকো পিজাররো ইনকা সাম্রাজ্যে প্রবেশ করেন। স্পেনীয়দের ব্যবহার করা শক্তিশালী বন্দুক ও কামানের সামনে ইনকারা সাধারণ তীর-বল্লম দিয়ে টিকতে পারেনি। তার বাহিনীই ধ্বংস করে দেয় ইনকা সাম্রাজ্য। শেষ সাপা আতাহুয়াল্পাকে পিজারো বাহিনী হত্যা করে।

Reactions

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ