হিংস্রতা মানুষের মনুষত্ব্যের বিনাশ করে
সাধারণত মানুষ হঠাৎ করে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে যে কোন অপ্রীতিকর কাজ করে ফেলতে পারেন। নিউরোলজিস্ট ডগলাস ফিল্ডস মস্তিষ্কের এ আচরণকে বলেন 'স্ন্যাপিং'। কিন্তু এমনটা কেন এবং কিভাবে ঘটে? বিশ্লেষণে বলা হয়, নৈতিকতা এবং মানসিক সমস্যার কারণে আকস্মিকভাবে আচরণের ছন্দপতন ঘটে তখন ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে। এর সার্কিট হয়ে কাজ করে মস্তিষ্কের একটি অংশ। মেঘে মেঘে ঘর্ষণের ফলে যেমন বিদ্যুৎ চমকায়/বজ্রপাত হয় ঠিক তেমনি উগ্র আচরণ মূলত আধুনিক জীবন এবং মস্তিষ্কের হার্ডওয়্যারের বিবর্তনের সংঘর্ষের কারণেই ঘটে থাকে। পৃথিবীর সব প্রাণীরই তার জীবনের হুমকি বোঝার ক্ষমতা রয়েছে মস্তিষ্কে। এই সার্কিট অনবরত আমাদের অভ্যন্তরীন এবং বহির্মুখী হুমকি খোঁজার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এটা এতটাই ধীর পদ্ধতি যে তা সহজে বোঝা যায় না। চেতনা তৈরি হয় মস্তিষ্কের গভীরের অংশে যার নাম হাইপোথ্যালামেটিক অ্যাটাক রিজিয়ন। এই অংশটি আত্মরক্ষা বা আগ্রাসী মনোভাব নিয়ন্ত্রণে কাজ করে।
হিংস্রতা এটা নয় যে কাউকে হত্যা করা। বিরক্তি, রাগ, কটুউক্তি বা কটু কথা, উপহাস করা, কাউকে লিখা দিয়ে হেনস্তা করা অথবা দৈহিক ভঙ্গি দিয়েও অবচেতন মনের বহিঃ প্রকাশ করাই হচ্ছে হিংসা বা হিংস্রতা। পাশে থাকা মানুষটিকে সহ্য করতে না পারলেই তাকে হয়ত কটুকথা বা কটুউক্তি অথবা উপহাস করি করে বসি। তুচ্ছ কারণে একজন আরেকজনের দ্বন্দ্ব ও বিরোধে জড়িয়ে যাচ্ছি যা থেকে জন্ম নিচ্ছে হিংস্রতা। হিংস্রতা মানুষের ভেতরেই রয়েছে কোন কোন পরিস্থিতিতে এটা ফেটে বেরোতে বাধ্য। তখন নিজেকে রোধ করা দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে; তৎক্ষণাত আগুনের মতো জ্বলে উঠে দাউ দাউ করে।
আমরা নিজেদের সভ্য দাবি করি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, প্রতিহিংসা পরায়নতা কমছে না বরং বাড়ছে। ইদানীং মানুষের মধ্যে অতিমাত্রায় জিঘাংসা, হিংস্রতা লক্ষ করা যাচ্ছে। সভ্যতার বয়স যতই বাড়ছে, আমার মনে হচ্ছে হিংস্রতা আর বর্বরতার প্রকোপ ততই বৃদ্ধি পাচ্ছে। কেন আমাদের ভিতরে এত বিদ্বেষ আর ঘৃণার বিষ সাথে নিয়ে পথ চলি? আমাদের অন্তরের গভীর থেকে এটা উপড়ে ফেলতে না পারি, তাহলে শান্তি নামক জিনিষটা আমাদের সব সময় নাগালের বাহিরে থেকে যাবে।
হিংস্রতা মানুষের মনুষত্ব্যের বিনাশ করে। কোন এক জ্ঞানী ব্যক্তির বাণী ছিল, “মানুষ যখন বাঘ শিকার করে তাকে শিকার খেলা বলে। আর বাঘ যখন মানুষ শিকার করে তাকে হিংস্রতা বলে।” প্রাণি মাত্রই মৃত্যুর সাধ গ্রহণ করতে হবে; সেটা কি মানুষ, জীবজন্তু বা জানোয়ার সবকিছূ হতে পারে। কিন্তু সেটা এভাবে হত্যার মাধ্যমে নয়, আসলে দু’টিই হিংস্রতা। একমাত্র প্রাণি মনে হয় টিকটিকি যার রক্ত সাদা, তেলেপোকা, কেঁচো, ফড়িং এর রক্ত নেই, মশা একজন থেকে রক্ত শোষন করে অন্যের শরীরে জীবাণু ছড়ায়। এই পড়ার কুকুর অন্য পাড়া থেকে আগত কুকুরকে ঘেউ ঘেউ করে তাড়িয়ে দেয়। তাহলে এর সাথে আমার পার্থক্যটা কোথায়?
আমরা পড়েছি, ”প্রাণ থাকিলে প্রাণি হয় কিন্তু মন না থাকিলে মানুষ হয় না।”
কবি নজরুল লিখেছেন, “কোথায় স্বর্গ কোথায় নরক কে বলে তা বহুদূর। ‘মানুষের মাঝে স্বর্গ-নরক, মানুষেতে সুরাসুর।”
বর্ণ বাদের জন্য ভূপেন হাজারিকার একটা গান আছে, “আমায় একজন সাদা মানুষ দাও যার রক্ত সাদা আমায় একজন কালো মানুষ দাও যার রক্ত কালো যদি দিতে পার প্রতিদান যা কিছু চাও হোক অমূল্য পেতেই পার।”
আমরা বার বার ভুলে যাই যে, প্রতিটি হিংসাই প্রতিহিংসার জন্ম দেয়। হিংসার আগুনে পুড়েও হিংসার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে মানুষই পারেন। যার মধ্যে রয়েছে একটা সংবেদনশীল মন, নৈতিক সাহস আর মানবিকতার প্রতি দায়বদ্ধতা। তার জন্য মনকে প্রস্তুত করতে হয় নিজের ভিতরের অসহিষ্ণু, আধিপত্যকামী মন আর হিংস্র প্রবণতা সম্পর্কে সচেতন।
যাতে আর বলতে না হয় বিজ্ঞান আমাদের দিয়েছে বেগ, কেড়ে নিয়েছে আবেগ ও বিবেক।

0 মন্তব্যসমূহ