Ad Code

Responsive Advertisement

অপ্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায়-ই কালক্রমে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় রূপান্তর



অপ্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায়-ই কালক্রমে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় রূপান্তর



শিক্ষা কাকে বলে?
সুরা বাকারার ৩১, ৩২ ও ৩৩ নং আয়াত “তিনি (আল্লাহ) আদমকে সব কিছুর নাম শিক্ষা দিলেন তারপর সে সব ফেরেস্তাদের সামনে প্রকাশ করলেন এবং বললেন, এই সমুদয়ের নাম বলে দাও তোমরা যদি সত্যবাদী হও। ফেরেস্তারা বললো, আপনি মহান, পবিত্র। আপনি যা শিক্ষা দিয়েছেন তা ছাড়া আমাদের তো কোন জ্ঞান নেই। নিশ্চয় আপনি জ্ঞানময় প্রজ্ঞাময়। তিনি (আল্লাহ) বললেন, হে আদম ফেরেস্তাদের এদের নাম বলে দাও, তিনি সে সবের নাম বলে দিলেন। অর্থাৎ শিক্ষা জিনিসটা আগমন কোথা থেকে নিশ্চয় বুঝলাম আমরা। আল্লাহ সরাসরি প্রথম নবী হযরত আদম (আঃ) শিখিয়ে ছিলেন।

শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) কিভাবে শিখলেন তার মতান্তর আছে, তাতে না গিয়ে আমি আল্লাহর পাক কালামের সরাসরি উদ্বৃতি দিয়ে দিলাম। এটাই সর্বপ্রথম ওহি যা হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর উপর অবতীর্ণ হয় যখন তিনি হেরা গুহায় আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন ছিলেন। হযরত জিবরাইল (আঃ) উনার নিকট এসে বললেন, “তুমি পড় তোমার প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন”- যা দিয়ে শুরু, দীর্ঘ তেইশ বছর ধরে সম্পূর্ণ কুরআন অবতীর্ণ হয়। মহানবী (সাঃ) ২৩ বছরে সমগ্র মানবজাতির জন্য এক অপূর্ব জাগরণ এনে দিয়েছেন। যারা এক দিন তার প্রাণের শত্রু ছিল তারাই তার শিক্ষা গ্রহণ করে ধন্য হয়েছেন। পৌত্তলিকতার মুখ তুবড়ে দিয়ে তিনি তাওহিদের পতাকা উড্ডীন করেছেন। আর এর সবই রাসুল (সঃ) এর মহান শিক্ষার ফলস্বরূপ। পৃথিবীতে শিক্ষার সূচনা তখন থেকে আমি ধরে নিলাম। ১ম নবী আদম (আঃ) থেকে শুরু করে শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) পর্যন্ত সবাইকে সরাসরি আল্লাহই সব শিক্ষা দিলেন।

শিক্ষা হলো চারিত্রিক গুণের অধিকারী, কোন ব্যক্তির অন্তর্নিহিত গুণাবলীর পূর্ণ বিকাশ এবং প্রতিষ্ঠালাভের জন্য যে সকল দক্ষতা প্রয়োজন সেগুলো অর্জনের পদ্ধতিগতভাবে জ্ঞানলাভের প্রক্রিয়া। ব্যাপক অর্থে শিক্ষা বলতে ভেতরের সম্ভাবনাকে বাইরে বের করে নিয়ে আসা এবং সম্ভাবনার পরিপূর্ণ বিকাশ সাধনের অব্যাহত অনুশীলন। আরো বলা যায় পাঠদান ও পাঠগ্রহণ থেকে আরম্ভ করে মানসিক, আত্মিক, নৈতিক ও শারীরিক পরিপূর্ণ বিকাশ উন্নয়ন, পরিশীলতা ও পৃথিবীতে চলার মৌলিক জ্ঞান বা দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞান হলো শিক্ষা। কোন নির্দিষ্ট একটি বিষয়ে দক্ষ হলেও তাকে আমরা শিক্ষা বলতে পারি, যেমন রাজমিস্ত্রি, গাড়ীর মেকানিক, কার্পেন্টার ইত্যাদি।

মূলত শিক্ষা মানুষের জীবনের আদি থেকে অন্ত পর্যন্ত। হাদিস মতে, “দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত শিক্ষা গ্রহণ করো।” মানুষ তার পূর্ণাঙ্গ জীবনে যা কিছুই আহরণ করে, আত্মস্থ করে, তা শিক্ষার মাধ্যমেই হয়ে থাকে। যে কোনো জ্ঞানার্জনের মাধ্যমই হলো শিক্ষা। শিক্ষা মানুষের অন্যতম মৌলিক অধিকার এবং শিক্ষা’ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শিক্ষা ব্যতীত মানুষ সত্যিকারের ‘মানুষ’ হতে পারেনা। আমার মতে, “সব সম্পত্তির অবচয় হয়; জ্ঞান/শিক্ষা এমন এক সম্পত্তি যার কোন অবচয় হয় না।”

শিক্ষার প্রকার ভেদঃ
শিক্ষা প্রধানত দুই প্রকার, ১) প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ২) অপ্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাঃ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে একটি নির্দিষ্ট মেয়াদকাল পর্যন্ত যে শিক্ষা আমরা গ্রহণ করি, তাই-ই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা। প্রকৃত শিক্ষা শুধুমাত্র কিছু তথ্যগত জ্ঞান নয়, প্রকৃত শিক্ষা হলো মানুষের মনোজাগতিক উৎকর্ষ সাধন। শিক্ষিত ব্যক্তির হৃদয়ের আলো বিচ্ছুরিত হয়ে সমাজ আলোকিত হয়। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে অন্ধকার বিরাজ করে শিক্ষার পরশে তা দূরীভূত হয়। আমরা যে বিদ্যা অর্জন করে সার্টিফিকেট পাই, তা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা। যেমন জেএসসি থেকে পিএচডি পর্যন্ত।
অপ্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাঃ সার্টিফিকেট নির্ভর শিক্ষার বাইরে যে শিক্ষা তা অপ্রাতিষ্ঠানিক। যা দ্বারা দক্ষতা অর্জন হয়, যেমনঃ রাজ মিস্ত্রি, গাড়ি চালক, গাড়ির মিস্ত্রি এমন অনেক। এমন লোক গুলোর অক্ষর জ্ঞান নেই কিন্তু দক্ষতার সাথে কার্য পরিচালনা করে। সিভিল ইঞ্জিনিয়ার যেভাবে একটা বিল্ডিং এর প্লান করে একজন রাজমিস্ত্রি ঠিক সেভাবে বিল্ডিং তৈরী করে দেয়। গাড়ীর ড্রাইভার যেভাবে হেলপারকে গাড়ী পরিচালনা করা শেখায় ঠিক সেভাবে ঐ হেলপার গাড়ী চালানো শিখে। তাদের মধ্যে যে শিখে সে ওস্তাদ বলে ডাকে যে শেখায় তাকে। একটা বাস্তব উদাহারণ পাঠকের সাথে শেয়ার করি; আমার ঘরে একজন টাইলস মিস্ত্রি কাজ করছিলেন। উনার হেলপার দাঁড়ানো আমি উনাকে জিজ্ঞেস করলাম উনি দাঁড়িয়ে আছেন কেন? উনিওতো কাজ করতে পারে। উনি আমাকে জবাব দিল, ”ও আমার শিষ্য, আমি যেমন করে কাজ করি সে তেমনভাবে কাজ করে। আমি এখনো অনুমতি দিনাই বলে সে কোন কাজে নিজ থেকে হাত দেয় না, আমার হেলপার হিসেবে থাকে। আমি যেখানে কাজ করি সে সেখানে হাত দেয় না, আমাকে সেভাবে সম্মান করে”। ওস্তাদের কথা শুনে আর শিষ্যের সম্মান দেখে আমি মুগ্ধ। যেখানে প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র-ছাত্রী শিক্ষকের কর্ম দোষে শিক্ষককে চোর ডাকে। “চোর কোন দিন আমার শিক্ষক হতে পারে না।” (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ঃ- ডাকসু নির্বাচন ২০১৯)।

উচ্চ শিক্ষার আলোকে শিক্ষা আবার তিন প্রকার। তিন প্রকার শিক্ষা হচ্ছেঃ-

১) আনুষ্ঠানিক শিক্ষা (Formal Education)

২) অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা (Non Formal Education)

৩) উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা (Informal Education)

আনুষ্ঠানিক শিক্ষাঃ স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন ইন্সটিটিউটের মাধ্যমে পূর্ব নির্ধারিত সময় সীমার মধ্যে নির্দিষ্ট বয়সে, নির্দিষ্ট শিক্ষাক্রম অনু্যায়ী স্তরে স্তরে যে শিক্ষা অর্জন করতে হয় তাকে আনুষ্ঠানিক শিক্ষা বা Formal Education বলে। আর্থ সামাজিক কর্মকাণ্ডের প্রসার এবং নতুন নতুন সাংস্কৃতিক উপাদান মানবসমাজের জ্ঞানও সংস্কৃতির সংরক্ষণ, ভবিষ্যৎ নাগরিকদের মধ্যে তা বিতরণ, উৎকর্ষসাধন এবং সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে দক্ষ জনশক্তি বা বিশেষজ্ঞ সরবরাহের জন্য অত্যন্ত সুসংগঠিতভাবে স্কুল কলেজের মাধ্যমে যে শিক্ষা তাকে আনুষ্ঠানিক শিক্ষা বলে। অন্যভাবে বলা যায়, শিক্ষার সর্বশেষ এবং কৃত্রিম ও নিয়ন্ত্রিত আধুনিক ধারাই হলো আনুষ্ঠানিক শিক্ষা যা, সম্পূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক।

অনানুষ্ঠানিক শিক্ষাঃ জন্ম থেকে শুরু করে মৃত্যু পর্যন্ত দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন ঘটনা প্রবাহের মাধ্যমে দেখে, শুনে, কাজ করে, অনুসরণ করে, চেষ্টা ও ত্রুটি বিচ্যুতি সত্ত্বেও নতুন নতুন অভিজ্ঞতার মাধ্যমেও নিজ নিজ পরিবেশের প্রভাবে যে শিক্ষা লাভ করে তাকে অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা বা Non Formal Education বলা হয়। এই শিক্ষা সে পরিবারের কাছে, সমাজের কাছে, বড়দের কাছ থেকে প্রতিনিয়ত নিজের তাগিদেই শিখছে। শিক্ষার প্রথম ধারার সূত্রপাত হয় এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। এই শিক্ষা সারা জীবন অব্যাহত থাকে। এজন্য হাদিসে আছে, “দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত শিক্ষা গ্রহণ কর।” বলা হয়, “শিশুর প্রথম শিক্ষক তার বাবা ও মা এবং তার পরিবেশ।”

উপানুষ্ঠানিক শিক্ষাঃ অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বহির্ভূত সুচিন্তিত ও সুসংগঠিত বিভিন্ন শিক্ষামূলক কর্মসূচী যার অধীনে বিভিন্ন বয়সের শিক্ষার্থীরা তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী স্বল্প সময়ে উপযুক্ত শিক্ষা লাভে সক্ষম হয়, তাকেই উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা বা Informal Education বলে। গণশিক্ষা, বয়স্ক শিক্ষা, বিভিন্ন প্রশিক্ষণ, যেমন: শস্য উৎপাদন, মৎস্য ও গৃহপালিত পশু পালন সহ নানা রকমের কর্মকান্ডমূলক শিক্ষাই হচ্ছে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা।

শিক্ষার উদ্দেশ্য কিঃ

শিক্ষা একটি জাতি গঠনের প্রধান উপাদান। একটি শিক্ষিত জাতিই পারে পৃথিবীর বুকে জায়গা করে নিতে এবং পারে একটি নতুন সভ্যতার জন্ম দিতে। প্রবাদ আছে, “শিক্ষা জাতীর মেরুদন্ড।” আসুন পৃথিবী সৃষ্টি থেকে শিক্ষা কিভাবে প্রতিফলিত হয়েছিল, আল্লাহর পাক কালাম ও হাদিস কি বলে? আসমানি কিতাব ১০৪ খানা, তন্মধ্যে প্রসিদ্ধ আসমানি কিতাব হচ্ছে ৪ খানাঃ তাওরাত, যবুর, ইঞ্জিল ও আল কোরআন। আল কোরআনে তা পুঙ্খানুপুঙ্খ ব্যাখ্যা দেয়া আছে। প্রত্যেক নবী ও রাসুল গুমরাহী মানুষকে সরল ও সঠিক পথ দেখানোর উদ্দেশ্যেই প্রেরিত হয়েছিলেন। তাঁরা নিজেদের উপর নাযিলকৃত আসমানি কিতাবে নির্দেশ মোতাবেক তার তাৎপর্য এবং লক্ষ্য উদ্দেশ্য সুস্পষ্টভাবে নিজ নিজ জাতি/গোষ্ঠির সামনে পেশ করেছেন। সর্বেশেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) বিপদগামী মানুষকে হেদায়াত দেয়ার জন্য পথ প্রদর্শক  হিসেবে আগমন করেছিলেন। অর্থাৎ প্রত্যেক নবী ও রাসুল শিক্ষকের ভূমিকায় লিপ্ত ছিলেন। কোরআনে এ ব্যাপারে আল্লাহতো বলেই দিয়েছেন, “আমি অন্য ভাষায় কোরআন নাযিল করতে পারতাম; আমি কোরআইশদের ভাষায় নাযিল করেছি যাতে তারা পড়ে বুঝেতে ও শিখতে পারে।” যাতে রাসুল কমির (সঃ) কোরাআন শিক্ষা দেয়ার সময় নিজ বংশীয় ও গোত্রের লোকদের বুঝাতে সুবিধা হয়।
শিক্ষা মানুষকে বন্য জীবন থেকে সভ্যতার আলোয় ফিরিয়ে মানুষকে মানুষ হিসেবে তৈরি করে সভ্যতার বিকাশ ঘটায়। “ধর্ম ও নৈতিকতার শিক্ষা সন্তানের জন্য সবচেয়ে বড় সম্পদ।”  “দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত শিক্ষা গ্রহন কর।” জ্ঞানীর ঘুম মূখ্যের ইবাদত অপেক্ষাও শ্রেষ্ঠ। রাসুল করিম (সঃ) উপর অবতীর্ণ আল কুরআন এবং উনার নিজের বাণী হাদীস থেকে শিক্ষার তাৎপর্য এবং লক্ষ্য উদ্দেশ্য দিবালোকের মতো পরিষ্কার।
শিক্ষাবিদ জন লকের মতে, “শিক্ষার উদ্দেশ্য হবে সুস্থ দেহে সুস্থ মন প্রতিপালনের নীতিমালা আয়ত্বকরণ।”
দার্শনিক ও শিক্ষাবিদগণ বিভিন্নভাবে শিক্ষার উদ্দেশ্যে বর্ণনা করে গেছেন ও শিক্ষার পরিচয় এবং সংজ্ঞা দেয়ার চেষ্টা করেছিলেন। এখন দেখা যাক, শিক্ষার উদ্দেশ্য সম্পর্কে কে কি বলেছিলেনঃ
কোন শ্রেণির বইতে পড়েছিলাম মনে পড়ছে না। প্রচলিত বাক্য হাদিস হিসেবে প্রসিদ্ধ লাভ করলেও প্রকৃত পক্ষে এটা হাদিস নয়। কার বাণি তাও জানি না, “তোমরা শিক্ষার জন্য সুদূর চীন দেশে যাও।”
জন ডিউই বলেছেন, “‌শিক্ষার উদ্দেশ্য আত্ম উপলদ্ধি।”
সক্রেটিসের মতে, “শিক্ষার উদ্দেশ্য হলো মিথ্যার বিনাশ আর সত্যের আবিষ্কার।”
প্লেটোর মত হলো, “শরীর ও আত্মার পরিপূর্ণ বিকাশ ও উন্নতির জন্য যা কিছু প্রয়োজন, তা সবই শিক্ষার উদ্দেশ্য অন্তর্ভূক্ত।”
এরিস্টোটল বলেছেন, “শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্যে হলো ধর্মীয় অনুশাসনের অনুমোদিত পবিত্র কার্যক্রমের মাধ্যমে সুখ লাভ করা।”
শিক্ষার অনেক লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের মধ্যে অন্যতম হলো শিক্ষার্থী যাতে তার অর্জিত জ্ঞান বাস্তবে প্রয়োগ করে জীবনের উন্নতি করতে পারে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মাধ্যমেই বর্তমানে মানুষ শিক্ষার যাত্রা শুরু করে, এরপর যে যতদূর অগ্রসর হতে পারে। এক সময় বর্তমানকালের মতো এমন বিধিবদ্ধ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সার্টিফিকেট প্রদানেরও কোনো কর্তৃপক্ষ ছিল না। তখন গুরুবাদী শিক্ষার প্রচলন ছিল। কোনো পণ্ডিত ব্যক্তির কাছে গিয়ে শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিরা শিষ্যত্ব গ্রহণ করতো এবং তার সহচর্যে থেকে শিক্ষা লাভ করতো সেটাই ছিল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা। দেয়া হতো না কোনো কাগজে প্রদত্ত সার্টিফিকেট। কোন নবী রাসুলের প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান ছিল না, ছিল না পৃথিবীর কোন শিক্ষক। উনাদের সরাসরি শিক্ষক ছিলেন আল্লাহ নিজেই। প্রকৃতপক্ষে মানুষ শিক্ষা গ্রহণ করে প্রকৃতি থেকে। প্রকৃতি হচ্ছে মানুষের সবচাইতে বড় শিক্ষক। কবি নজরুল, মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানি উনাদের কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না। এটা ভুলে গেলেও চলবে না, বিশ্বের অসংখ্য মনীষীরাও কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত ছিল না। অথচ উনাদের দেয়া জ্ঞানভাণ্ডার অধ্যয়ন করেই আমরা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে অর্জিত জ্ঞানের সার্টিফিকেট অর্জন করি। উনাদের লেখার উপর অধ্যায়ন ও গবেষণা করে শিশু শ্রেণি থেকে আরম্ভ করে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করে আমরা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছি।

শিক্ষার পদ্ধতি
প্রাচীন ও মধ্য যুগীয় শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষক ছিলেন শিক্ষা প্রক্রিয়ার কেন্দ্রবিন্দু ও শিক্ষাদান পদ্ধতি ছিলো শিক্ষককেন্দ্রিক এবং পাঠদানকালে শিক্ষক মূল ভূমিকায় থাকতো। বর্তমানে তা পাল্টে গিয়ে শিক্ষাদান পদ্ধতি শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক হয়েছে। শিক্ষা দেয়ার কার্যক্রমের প্রয়োজনীয় তিনটি উপাদান হচ্ছে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও শিক্ষণীয় বিষয়বস্তু। কালের পরিক্রমায় আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষার্থীরাই মুখ্য।
শিক্ষককেন্দ্রিক পদ্ধতিঃ এই পদ্ধতিতে শিক্ষকের স্থান বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ এবং শিক্ষক শিক্ষার কেন্দ্রবিন্দু। শিক্ষাকে দ্বিমুখী প্রক্রিয়া হিসাবে বিবেচনা করা হয় এর একপ্রান্তে শিক্ষক আর অন্য প্রান্তে শিক্ষার্থী। জ্ঞান বা বিষয়বস্তু হলো সংযোগের মাধ্যম অর্থাৎ জ্ঞান শিক্ষকের দিক থেকে শিক্ষর্থীদের দিকে প্রবাহিত হয়। এখানে শিক্ষক সক্রিয় আর শিক্ষার্থী নিষ্ক্রিয় উপাদান মাত্র। শিক্ষক জ্ঞানের আধার, আর সেই আধার থেকে তিনি জ্ঞান বিতরণ করেন। শিক্ষক যা বলবেন শিক্ষার্থী কোন রকম বিচার বিশ্লেষণ ছাড়াই তা গ্রহণ করবে। শিক্ষর্থীর গ্রহণ ক্ষমতা কতটুকু, শিক্ষার্থীর চাহিদা কি, সে কি শিখতে চায় শিক্ষক এ বিষয় নিয়ে ভাববার কোন অবকাশ নেই। তিনি পূর্ব পরিকল্পিত গতানুগতিক রীতিতে শিক্ষার্থীর জীবন ধারণের জন্য যে সব জ্ঞান বা অভিজ্ঞতা অপরিহার্য বলে মনে করেন, তাই বিতরণ করেন। শিক্ষকের উদ্দেশ্য শিক্ষার্থীর জীবনকে গড়িয়ে পিটিয়ে আদর্শ জীবন গঠনে শিক্ষার্থীকে সাহায্য করা। শিক্ষককেন্দ্রিক যে কয়টি পদ্ধতি তা নিন্মে সামান্য বিশ্লেষণ করা হলোঃ-
১) বক্তৃতা নির্ভর পদ্ধতিঃ এই পদ্ধতি একমুখী প্রক্রিয়া যেখানে শিক্ষক বলেন, শিক্ষার্থীরা শোনে। শিক্ষক শিক্ষার্থীকে প্রশ্ন করার বা শিক্ষার্থীরা শিক্ষককে প্রশ্ন করার কোনো সুযোগ থাকে না বা থাকলে সে সুযোগ থেকে শিক্ষার্থী বঞ্চিত হয় অথবা শিক্ষার্থীকে কোন প্রকার সুযোগ দেয়া হয় না প্রশ্ন করার।
২) প্রশ্নোত্তর পদ্ধতিঃ এই পদ্ধতি একটি দ্বিমুখী প্রক্রিয়া। শিক্ষক প্রশ্ন করেন শিক্ষার্থী উত্তর দেয়। শিক্ষার্থীদের শিক্ষককে প্রশ্ন করার কোন অবকাশ নেই। এই পদ্ধতি অনুসরণ করে শিক্ষক ছোট, ছোট প্রশ্নের মাধ্যমে পাঠের বিষয়বস্তুকে শিক্ষার্থীদের কাছে উপস্থাপন করেন। শিক্ষার্থীরা সে সকল প্রশ্নের উত্তর দান করে পাঠ্যবিষয় সম্পর্কে ধারণা লাভ করতে পারে। শিক্ষার্থীদের শিক্ষককে প্রশ্ন করার কোন সুযোগ নেই বা প্রশ্ন করার সুযোগ থাকলেও শিক্ষকরা সময় স্বল্পতার অজুহাত দিয়ে এড়িয়ে যায় ।
৩) প্রদর্শন পদ্ধতিঃ শ্রেণিতে পাঠদান কোনো ঘটনা বা বিষয় প্রত্যক্ষভাবে উপস্থাপনের প্রক্রিয়াই হচ্ছে প্রদর্শন পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে শিক্ষক শিক্ষার্থীদের কিছু করে দেখাবেন। এই পদ্ধতিতে শিক্ষক উপস্থাপকের ভূমিকা পালন করে বিভিন্ন শিক্ষা উপকরণের সাহায্যে এবং মৌখিক বিবৃতির মাধ্যমে বিষয়বস্তু শিক্ষার্থীদের শিখাতে চেষ্টা করেন। এই পদ্ধতির সবচেয়ে ফলদায়ক দিক হলো শিক্ষার্থী সক্রিয় থেকে পাঠ্যবিষয় অনুধাবন করে ফলে পাঠ বহুলাংশে ফলপ্রসূ হয়। এই পদ্ধতিতে পাঠদান করলে শিক্ষার্থীর মনে শিক্ষণীয় বিষয়টি স্থায়ী হয়।
৪) টিউটোরিয়াল পদ্ধতিঃ এ পদ্ধতিতে শিক্ষক পরামর্শদাতার ভূমিকা পালন করেন। শিক্ষার্থীর সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগিয়ে পারষ্পরিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের উপায় খুঁজে বের করে। বর্তমানে এ পদ্ধতি অনুসরণ করে উচ্চতর শ্রেণিতে শিক্ষার্থীদের পাঠের বিশেষ দিকগুলো সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা প্রদান করা হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তাদের পাঠের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর ওপর প্রশ্নোত্তর লিখতে বা নিবন্ধ রচনা করতে দেয়া হয়। বস্তুত এই পদ্ধতি শিক্ষককেন্দ্রিক পাঠদান পদ্ধতির একটি উন্নত ব্যবস্থা।
৫) পূর্ব নির্ধারিত পাঠঃ শিক্ষক পাঠ্যবিষয়ে সহায়ক গ্রন্থ পাঠের নির্দেশ প্রদান করেন। সেই নির্দেশ মতোবেক শিক্ষার্থীরা পাঠ্যবিষয়টি পড়ে ও বুঝে নিজেরাই নিজেদের পাঠ্যবিষয়টি অনুশীলনের মাধ্যমে তাদের চিন্তা-ভাবনা ও মতামত প্রকাশ করে। ফলে শিক্ষার্থীর কল্পনাশক্তি, বিচার-বিশ্লেষণ ক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের দক্ষতা বৃদ্ধি পায়।
শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক পদ্ধতিঃ আধুনিক শিক্ষণব্যবস্থায় শিক্ষার্থীর নিজস্ব প্রয়োজন, সামর্থ্য, আগ্রহ, পছন্দ-অপছন্দের ওপর বেশি গুরুত্বারোপ করা হয়। ফলে শিক্ষাব্যবস্থায়ও শিক্ষা পদ্ধতির আমূল সংস্কারের প্রেক্ষিতে শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা নতুনরূপে আত্মপ্রকাশ করেছে। এ শিক্ষণব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, শিক্ষার্থীর স্বাধীনতার স্বীকৃতি, শিখনে তার সক্রিয় অংশগ্রহণ, তার পরিবেশ ও অভিজ্ঞতার ওপর অধিক গুরুত্বারোপ, সুশৃঙ্খল মানবশক্তির অধিকারী করে তোলা, সৃজনশীলতার উদ্দীপনা সৃষ্টি এবং ব্যক্তিসত্তার পূর্ণ বিকাশ। শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক শিক্ষা পদ্ধতির উল্লেখযোগ্য কয়েকটি এখানে আলোচনা করা হলোঃ-
১) আলোচনা পদ্ধতিঃ এ পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীরা সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য সামনে রেখে শিক্ষক বা দলনেতা মিলে পরষ্পর মুখোমুখি বসে স্বাধীনভাবে আলোচনা পর্যালোচনা করে বিভিন্ন দিক সম্পর্কে মতবিনিময়, তথ্য সংগ্রহ, সমস্যার স্বরূপ ও পরিধি সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা লাভ করে। এরপর যথাযথ কারণগুলো শনাক্ত করে সবদিক বিবেচনা করে তারা সম্ভাব্য সমাধানের পথ খুঁজে সমাধান বের করে নেয়। এর সুফল হলো শিক্ষার্থীরা মুখস্থ বিদ্যার ওপর নির্ভরশীল হতে হয় না। শিক্ষার্থীরা নিজের চেষ্টায় শিখতে পারে এবং স্ব-চেষ্টায় জ্ঞান অর্জন করার ফলে তা স্থায়ী হয়।
২) প্যানেল আলোচনা পদ্ধতিঃ এ পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে থেকে সাধারণত পাঁচ বা ছয়জন প্রতিনিধি আগে থেকে মনোনয়ন দিয়ে একটি প্যানেল তৈরি করা হয়। সেই প্যানেলভুক্ত শিক্ষার্থীরা নির্দিষ্ট বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করে তা শিক্ষার্থীদের সামনে উপস্থাপন করে। শিক্ষক প্যানেলভুক্ত দলের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের দায়িত্ব পালন করেন এবং আলোচনা পরিচালনা করেন। তিনি প্রথমে আলোচ্য বিষয়টি সবার সম্মুখে তুলে ধরেন ও আলোচনার শুরুতে প্রতিনিধিদের ভূমিকা ব্যাখ্যা করেন।
৩) সেমিনারঃ সাধারণত সেমিনার বলতে আলোচনা ও গবেষণার জন্য কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ ও সমস্যামূলক কোনো বিষয়ের উপর নিজেদের মতামত ব্যক্ত করা। প্রাসঙ্গিক গ্রন্থাদি থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করে নির্ধারিত দিনে আলোচনা অনুষ্ঠানে আলোচ্য বিষয়ের উপর সংগৃহীত তথ্যের রিপোর্ট প্রদান করে, এই রিপোর্ট নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা এবং মূল্যায়নের ভিত্তিতে বক্তব্য উপস্থাপন করা হয়। এ কাজ তারা ব্যক্তিগতভাবে একক প্রচেষ্টায় অথবা ছোট ছোট দলগঠন করেও করতে পারে। সেমিনার শিক্ষার্থীদের স্বাধীনভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা বাড়ায় এবং স্বকিয় শিক্ষালাভের একটি উৎকৃষ্ট পন্থা হিসেবে ধরে নেয়া যায়।
৪) সিম্পোজিয়াঃ সিম্পোজিয়া পদ্ধতিতে দুই বা ততোধিক শিক্ষার্থী আলোচ্যবিষয় বা সমস্যার ওপর আগেই প্রবন্ধ রচনা করে নিয়ে আসে। উক্ত বিষয়ে একক/দলগতভাবে বিভিন্ন মতের সংগ্রহ করে আলোচনা সমালোচনার মাধ্যমে পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করে। তবে পরিচালনার দিক থেকে এর কিছু বৈশিষ্ট্য আছে। তারা প্রথমে তাদের লিখিত প্রবন্ধ কিংবা মৌখিক বিবৃতি পেশ করে। বিভিন্ন বক্তা বিষয়টির উপর নতুন তথ্য পরিবেশন করে। এভাবে কয়েকটি বক্তৃতার মাধ্যমে বিষয়গুলো আরো পরিপূর্ণ বিশ্লেষণ করা হয়।
৫) এসাইনেমেন্টঃ অ্যাসাইনমেন্ট হ'ল একটি নির্দিষ্ট সময় বেধে দিয়ে শিক্ষার্থীদের দেয়া একডেমিক কাজের একটি অংশ যা সে ঘরে/ ক্লাসে বসে নিজ দায়িত্বে সম্পন্ন করে। সাধারণত পাঠের অংশ হিসাবে শিক্ষক শিষ্য দ্বারা প্রদত্ত যে কোনও অনুশীলন, বা অধ্যয়নের জন্য প্রস্তাবিত কোনও কাজকে অ্যাসাইনমেন্ট বলে। যে কোনও শিক্ষার মূল লক্ষ্য হ'ল শিক্ষার্থীকে তার নিজের দায়িত্ব নিয়ে কাজ করা শেখানো।
এ বছর কোভিড-১৯ মহামারির কারণে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শ্রেণি কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে তাই স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। ফলে ২০২০ শিক্ষাবর্ষের নির্ধারিত পাঠ্যসূচি কোথাও সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। এমতাবস্থায় শিক্ষার্থী যেন আরও কিছু শিখনফল অর্জন করে পরবতী শ্রেণির জন্য প্রস্তুত হতে পারে সেই বিষয়টি বিবেচনায় এনে তাদের পাঠ্যসূচি পূণর্বিন্যাস এসাইনমেন্টের মাধ্যমে মূল্যায়নের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এই মূল্যায়নের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের অর্জিত শিখন ফলের সবলতা বা দূর্বলতা চিহ্নিত করে পরবর্তী শ্রেণিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি ও স্বাস্থ্য নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে সরকার প্রথাগতভাৰে বার্ষিক পরীক্ষা না নেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। তবে অ্যাসাইনমেন্টের মাধ্যমে তাদের অর্জিত শিখনফল মূল্যায়ন করা হবে। পুনর্বিন্যাসকৃত পাঠ্যসূচির ভিত্তিতে কোন সপ্তাহে শিক্ষার্থীর কী মূল্যায়ন করা হবে সে বিবেচনায় এ্যাসাইনমেন্ট বা নির্ধারিত কাজ প্রণয়ন করা হয়েছে। প্রতি সপ্তাহের শুরুতে ঐ সপ্তাহের জন্য নির্ধারিত এ্যাসাইনমেন্টগুলো দেয়া হবে এবং সপ্তাহ শেষে শিক্ষার্থীরা তাদের এ্যাসাইনমেন্ট শেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জমা দিয়ে (অভিভাবক বা অন্য কারও মাধ্যমে অন-লাইনে) নতুন এ্যাসাইনমেন্ট গ্রহণ করবে।
আধুনিক শিক্ষা পদ্ধতিঃ বতর্মান যুগে শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য প্রয়োজন শিক্ষকের শিক্ষাদান পদ্ধতির মানোন্নয়ন। শিক্ষাদানে যথাযথ পদ্ধতি ও কৌশল অনুসরণের মাধ্যমে পড়ালেখাকে শিক্ষার্থীদের কাছে আকষর্ণীয় ও স্বতঃস্ফুত করা যায়। একবিংশ শতাব্দীর গ্লোবাল ভিলেজের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য এবং শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য প্রয়োজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক। বতর্মানে যোগ্য শিক্ষক হতে হলে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের জানতে হবে আধুনিক শিক্ষাদান পদ্ধতির কৌশল ও শ্রেণিব্যবস্থাপনা।
বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে আধুনিক শিক্ষাদান পদ্ধতি হচ্ছে সম্পূর্ণ প্রযুক্তিনির্ভর। শিক্ষকগণ মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমে শিক্ষার্থীদের প্রজেক্টরের মাধ্যমে শিক্ষাদান করেন। পৃথিবীর উন্নত বিশ্বের স্কুল-কলেজগুলোতে শিক্ষকগণ যেভাবে পাঠদান করে আসছে তাদের সাথে সমতা রেখে শিক্ষাদান কার্যক্রম পরিচালনা করলেই তা হবে যুগোপযোগী।
শিক্ষাবিদদের মতে, দেশের সকল শিক্ষার্থীকে সুষম ও মানসম্মত শিক্ষা প্রদানের জন্য শ্রেণি ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব অনেক বেশি। উপযুক্ত পদ্ধতি ও কৌশলের মাধ্যমে পাঠদানকে ফলপ্রসূ করা এবং কার্যকরী পাঠ পরিচালনার ব্যবস্থা গ্রহণকে শ্রেণি ব্যবস্থাপনা বলে। পাঠদান পদ্ধতিকে শিক্ষার্থীর হৃদয়গ্রাহী, তথ্যনির্ভর এবং আকর্ষণীয় করে গড়ে তুলতে হলে শিক্ষককে শ্রেণি-ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিতে হবে। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকদের ক্ষমতা প্রয়োগ ও নিয়ন্ত্রণ সহযোগিতামূলক হতে হবে। শ্রেণি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে যে কোনো ত্রুটি শিক্ষণ শিখনের আধুনিক এ পদ্ধতির সফল বাস্তবায়নে ব্যাঘাত ঘটবে। তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শ্রেণিকক্ষ এমনভাবে স্থাপন ও সাজানো উচিত যাতে শ্রেণিকক্ষটি সহজেই শিক্ষার্থীদের নিকট আর্কষণীয় হয়ে ওঠে। নিজ গৃহে ছেলেমেয়েরা যেমন স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে ঠিক তেমনি আনন্দদায়ক ও আকর্ষণীয় করে শ্রেণিকক্ষ তৈরি করা দরকার শিক্ষার্থীর জন্য।
বর্তমান শিক্ষাদান পদ্ধতি হাতে-কলমে উপকরণ ব্যবহারের মাধ্যমে করতে হয়। বিষয়বস্তুর সাথে মিল রেখে শিক্ষক নিজেই উপকরণ তৈরি করে শিক্ষাদানকার্য পরিচালনা করবেন। শিক্ষকতা কোনো যান্ত্রিক প্রক্রিয়া নয়, শিক্ষকতা হলো এক ধরনের সৃষ্টিধর্মী প্রক্রিয়া। শিক্ষকের বিষয়বস্তু সম্পর্কে যেমন গভীর জ্ঞান অর্জন করা প্রয়োজন, তেমনি শিক্ষাদান পদ্ধতি সম্পর্কে সকল প্রকার ব্যবহারিক গবেষণা ও নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবনে আত্মনিয়োগ করা উচিত। শিক্ষকতা তখনই সার্থক ও সফল হবে যখন শিক্ষকের নিজস্ব বুদ্ধি-বিবেচনা ও চিন্তাশক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর শিখন সহজ ও স্বতঃস্ফূর্ত হবে।
কোরআন এবং হাদিস দ্বারাও তা প্রমাণিত, ‘‘বল, যারা জানে আর যারা জানে না, তারা কি সমান হতে পারে?” (সূরাহ্ যুমার ৩৯/৯)। ”বলা ও করার পূর্বে জ্ঞান আবশ্যক।”
একথা বলা যায় যে, একজন আদর্শ অভিজ্ঞ শিক্ষক তার মেধা ও মননশক্তি খাটিয়ে বুঝতে পারবেন কোন পদ্ধতিতে পাঠদান করলে শতভাগ সফল হবেন এবং তিনি সেই পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাদান করবেন। শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে শিক্ষকের নিজস্ব কৌশল হচ্ছে সবচেয়ে উত্তম কৌশল। তবে শিক্ষককে খেয়াল রাখতে হবে শ্রেণিশাসন কিংবা শ্রেণি নিয়ন্ত্রণের জন্যে শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিকভাবে আঘাত বা চাপ দেয়া কোন অবস্থাতেই কাম্য নয়। প্রয়োজনে হাতে-কলমে শিক্ষাদান করে শিক্ষাদান কার্যক্রমকে আনন্দ ও শ্রুতিমধুর এবং প্রাঞ্জল করে তুলবেন।
যিনি কোনোদিন বিদ্যালয়ে গমন করেননি তিনিও বিভিন্ন বিদ্যায় পারদর্শী। ওই বিদ্যা দ্বারা তিনি জীবিকা নির্বাহ করছেন এবং সমাজও উপকৃত হচ্ছে। বেঁচে থাকার এ সংগ্রামে সহায়ক যা কিছু সবই শিক্ষার অঙ্গীভূত। সুতরাং বলা যায়, অপ্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা হতেই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার উৎপত্তি।

Reactions

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ