অপ্রাতিষ্ঠানিক
শিক্ষায়-ই কালক্রমে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় রূপান্তর
সুরা বাকারার ৩১, ৩২ ও ৩৩ নং আয়াত “তিনি (আল্লাহ) আদমকে সব কিছুর নাম শিক্ষা দিলেন তারপর সে সব ফেরেস্তাদের সামনে প্রকাশ করলেন এবং বললেন, এই সমুদয়ের নাম বলে দাও তোমরা যদি সত্যবাদী হও। ফেরেস্তারা বললো, আপনি মহান, পবিত্র। আপনি যা শিক্ষা দিয়েছেন তা ছাড়া আমাদের তো কোন জ্ঞান নেই। নিশ্চয় আপনি জ্ঞানময় প্রজ্ঞাময়। তিনি (আল্লাহ) বললেন, হে আদম ফেরেস্তাদের এদের নাম বলে দাও, তিনি সে সবের নাম বলে দিলেন। অর্থাৎ শিক্ষা জিনিসটা আগমন কোথা থেকে নিশ্চয় বুঝলাম আমরা। আল্লাহ সরাসরি প্রথম নবী হযরত আদম (আঃ) শিখিয়ে ছিলেন।
শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) কিভাবে
শিখলেন তার মতান্তর আছে, তাতে না গিয়ে আমি আল্লাহর পাক কালামের সরাসরি উদ্বৃতি
দিয়ে দিলাম। এটাই সর্বপ্রথম ওহি যা হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর উপর অবতীর্ণ হয় যখন তিনি
হেরা গুহায় আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন ছিলেন। হযরত জিবরাইল (আঃ) উনার নিকট এসে বললেন,
“তুমি পড় তোমার প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন”- যা দিয়ে শুরু, দীর্ঘ তেইশ
বছর ধরে সম্পূর্ণ কুরআন অবতীর্ণ হয়। মহানবী (সাঃ) ২৩ বছরে সমগ্র মানবজাতির জন্য
এক অপূর্ব জাগরণ এনে দিয়েছেন। যারা এক দিন তার প্রাণের শত্রু ছিল তারাই তার শিক্ষা
গ্রহণ করে ধন্য হয়েছেন। পৌত্তলিকতার মুখ তুবড়ে দিয়ে তিনি তাওহিদের পতাকা উড্ডীন
করেছেন। আর এর সবই রাসুল (সঃ) এর মহান শিক্ষার ফলস্বরূপ। পৃথিবীতে শিক্ষার সূচনা
তখন থেকে আমি ধরে নিলাম। ১ম নবী আদম (আঃ) থেকে শুরু করে শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ
(সঃ) পর্যন্ত সবাইকে সরাসরি আল্লাহই সব শিক্ষা দিলেন।
শিক্ষা
হলো চারিত্রিক গুণের অধিকারী, কোন ব্যক্তির অন্তর্নিহিত গুণাবলীর
পূর্ণ বিকাশ এবং প্রতিষ্ঠালাভের জন্য যে সকল দক্ষতা প্রয়োজন সেগুলো অর্জনের পদ্ধতিগতভাবে
জ্ঞানলাভের প্রক্রিয়া। ব্যাপক অর্থে শিক্ষা বলতে ভেতরের
সম্ভাবনাকে বাইরে বের করে নিয়ে আসা এবং সম্ভাবনার পরিপূর্ণ বিকাশ সাধনের অব্যাহত অনুশীলন।
আরো বলা যায় পাঠদান ও পাঠগ্রহণ থেকে
আরম্ভ করে মানসিক, আত্মিক, নৈতিক ও শারীরিক পরিপূর্ণ বিকাশ উন্নয়ন, পরিশীলতা ও পৃথিবীতে
চলার মৌলিক জ্ঞান বা দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞান হলো শিক্ষা। কোন নির্দিষ্ট একটি বিষয়ে দক্ষ হলেও তাকে আমরা শিক্ষা বলতে পারি, যেমন
রাজমিস্ত্রি, গাড়ীর মেকানিক, কার্পেন্টার ইত্যাদি।
মূলত শিক্ষা মানুষের জীবনের আদি থেকে
অন্ত পর্যন্ত। হাদিস মতে, “দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত শিক্ষা গ্রহণ করো।” মানুষ তার
পূর্ণাঙ্গ জীবনে যা কিছুই আহরণ করে, আত্মস্থ করে, তা শিক্ষার মাধ্যমেই হয়ে থাকে।
যে কোনো জ্ঞানার্জনের মাধ্যমই হলো শিক্ষা। শিক্ষা মানুষের অন্যতম মৌলিক অধিকার এবং
শিক্ষা’ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শিক্ষা ব্যতীত মানুষ সত্যিকারের ‘মানুষ’ হতে
পারেনা। আমার
মতে, “সব সম্পত্তির অবচয় হয়; জ্ঞান/শিক্ষা এমন
এক সম্পত্তি যার কোন অবচয় হয় না।”
শিক্ষা প্রধানত দুই প্রকার, ১) প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ২) অপ্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাঃ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে একটি নির্দিষ্ট মেয়াদকাল পর্যন্ত যে শিক্ষা আমরা গ্রহণ করি, তাই-ই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা। প্রকৃত শিক্ষা শুধুমাত্র কিছু তথ্যগত জ্ঞান নয়, প্রকৃত শিক্ষা হলো মানুষের মনোজাগতিক উৎকর্ষ সাধন। শিক্ষিত ব্যক্তির হৃদয়ের আলো বিচ্ছুরিত হয়ে সমাজ আলোকিত হয়। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে অন্ধকার বিরাজ করে শিক্ষার পরশে তা দূরীভূত হয়। আমরা যে বিদ্যা অর্জন করে সার্টিফিকেট পাই, তা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা। যেমন জেএসসি থেকে পিএচডি পর্যন্ত।
উচ্চ
শিক্ষার আলোকে শিক্ষা আবার তিন প্রকার। তিন প্রকার শিক্ষা হচ্ছেঃ-
১) আনুষ্ঠানিক শিক্ষা
(Formal Education)
২) অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা
(Non Formal Education)
৩) উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা
(Informal Education)
আনুষ্ঠানিক
শিক্ষাঃ স্কুল,
কলেজ, মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন ইন্সটিটিউটের মাধ্যমে পূর্ব নির্ধারিত
সময় সীমার মধ্যে নির্দিষ্ট বয়সে, নির্দিষ্ট শিক্ষাক্রম অনু্যায়ী স্তরে স্তরে যে
শিক্ষা অর্জন করতে হয় তাকে আনুষ্ঠানিক শিক্ষা বা Formal Education বলে। আর্থ
সামাজিক কর্মকাণ্ডের প্রসার এবং নতুন নতুন সাংস্কৃতিক উপাদান মানবসমাজের জ্ঞানও
সংস্কৃতির সংরক্ষণ, ভবিষ্যৎ নাগরিকদের মধ্যে তা বিতরণ, উৎকর্ষসাধন এবং সমাজের
বিভিন্ন ক্ষেত্রে দক্ষ জনশক্তি বা বিশেষজ্ঞ সরবরাহের জন্য অত্যন্ত সুসংগঠিতভাবে
স্কুল কলেজের মাধ্যমে যে শিক্ষা তাকে আনুষ্ঠানিক শিক্ষা বলে। অন্যভাবে বলা যায়,
শিক্ষার সর্বশেষ এবং কৃত্রিম ও নিয়ন্ত্রিত আধুনিক ধারাই হলো আনুষ্ঠানিক শিক্ষা যা,
সম্পূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক।
অনানুষ্ঠানিক
শিক্ষাঃ জন্ম
থেকে শুরু করে মৃত্যু পর্যন্ত দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন ঘটনা প্রবাহের মাধ্যমে
দেখে, শুনে, কাজ করে, অনুসরণ করে, চেষ্টা ও ত্রুটি বিচ্যুতি সত্ত্বেও নতুন নতুন
অভিজ্ঞতার মাধ্যমেও নিজ নিজ পরিবেশের প্রভাবে যে শিক্ষা লাভ করে তাকে অনানুষ্ঠানিক
শিক্ষা বা Non Formal Education বলা হয়। এই শিক্ষা সে পরিবারের কাছে, সমাজের কাছে,
বড়দের কাছ থেকে প্রতিনিয়ত নিজের তাগিদেই শিখছে। শিক্ষার প্রথম ধারার সূত্রপাত হয়
এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। এই শিক্ষা সারা জীবন অব্যাহত থাকে। এজন্য হাদিসে আছে,
“দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত শিক্ষা গ্রহণ কর।” বলা হয়, “শিশুর প্রথম শিক্ষক তার বাবা
ও মা এবং তার পরিবেশ।”
উপানুষ্ঠানিক
শিক্ষাঃ অনানুষ্ঠানিক
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বহির্ভূত সুচিন্তিত ও সুসংগঠিত বিভিন্ন শিক্ষামূলক কর্মসূচী যার
অধীনে বিভিন্ন বয়সের শিক্ষার্থীরা তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী স্বল্প সময়ে উপযুক্ত
শিক্ষা লাভে সক্ষম হয়, তাকেই উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা বা Informal Education বলে।
গণশিক্ষা, বয়স্ক শিক্ষা, বিভিন্ন প্রশিক্ষণ, যেমন: শস্য উৎপাদন, মৎস্য ও গৃহপালিত
পশু পালন সহ নানা রকমের কর্মকান্ডমূলক শিক্ষাই হচ্ছে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা।
শিক্ষার
উদ্দেশ্য কিঃ
শিক্ষাবিদ জন লকের মতে, “শিক্ষার উদ্দেশ্য হবে সুস্থ দেহে সুস্থ মন প্রতিপালনের নীতিমালা আয়ত্বকরণ।”
দার্শনিক ও শিক্ষাবিদগণ বিভিন্নভাবে শিক্ষার উদ্দেশ্যে বর্ণনা করে গেছেন ও শিক্ষার পরিচয় এবং সংজ্ঞা দেয়ার চেষ্টা করেছিলেন। এখন দেখা যাক, শিক্ষার উদ্দেশ্য সম্পর্কে কে কি বলেছিলেনঃ
কোন শ্রেণির বইতে পড়েছিলাম মনে পড়ছে না। প্রচলিত বাক্য হাদিস হিসেবে প্রসিদ্ধ লাভ করলেও প্রকৃত পক্ষে এটা হাদিস নয়। কার বাণি তাও জানি না, “তোমরা শিক্ষার জন্য সুদূর চীন দেশে যাও।”
জন ডিউই বলেছেন, “শিক্ষার উদ্দেশ্য আত্ম উপলদ্ধি।”
সক্রেটিসের মতে, “শিক্ষার উদ্দেশ্য হলো মিথ্যার বিনাশ আর সত্যের আবিষ্কার।”
প্লেটোর মত হলো, “শরীর ও আত্মার পরিপূর্ণ বিকাশ ও উন্নতির জন্য যা কিছু প্রয়োজন, তা সবই শিক্ষার উদ্দেশ্য অন্তর্ভূক্ত।”
শিক্ষার অনেক লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের মধ্যে অন্যতম হলো শিক্ষার্থী যাতে তার অর্জিত জ্ঞান বাস্তবে প্রয়োগ করে জীবনের উন্নতি করতে পারে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মাধ্যমেই বর্তমানে মানুষ শিক্ষার যাত্রা শুরু করে, এরপর যে যতদূর অগ্রসর হতে পারে। এক সময় বর্তমানকালের মতো এমন বিধিবদ্ধ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সার্টিফিকেট প্রদানেরও কোনো কর্তৃপক্ষ ছিল না। তখন গুরুবাদী শিক্ষার প্রচলন ছিল। কোনো পণ্ডিত ব্যক্তির কাছে গিয়ে শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিরা শিষ্যত্ব গ্রহণ করতো এবং তার সহচর্যে থেকে শিক্ষা লাভ করতো সেটাই ছিল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা। দেয়া হতো না কোনো কাগজে প্রদত্ত সার্টিফিকেট। কোন নবী রাসুলের প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান ছিল না, ছিল না পৃথিবীর কোন শিক্ষক। উনাদের সরাসরি শিক্ষক ছিলেন আল্লাহ নিজেই। প্রকৃতপক্ষে মানুষ শিক্ষা গ্রহণ করে প্রকৃতি থেকে। প্রকৃতি হচ্ছে মানুষের সবচাইতে বড় শিক্ষক। কবি নজরুল, মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানি উনাদের কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না। এটা ভুলে গেলেও চলবে না, বিশ্বের অসংখ্য মনীষীরাও কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত ছিল না। অথচ উনাদের দেয়া জ্ঞানভাণ্ডার অধ্যয়ন করেই আমরা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে অর্জিত জ্ঞানের সার্টিফিকেট অর্জন করি। উনাদের লেখার উপর অধ্যায়ন ও গবেষণা করে শিশু শ্রেণি থেকে আরম্ভ করে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করে আমরা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছি।
১) বক্তৃতা নির্ভর পদ্ধতিঃ এই পদ্ধতি একমুখী প্রক্রিয়া যেখানে শিক্ষক বলেন, শিক্ষার্থীরা শোনে। শিক্ষক শিক্ষার্থীকে প্রশ্ন করার বা শিক্ষার্থীরা শিক্ষককে প্রশ্ন করার কোনো সুযোগ থাকে না বা থাকলে সে সুযোগ থেকে শিক্ষার্থী বঞ্চিত হয় অথবা শিক্ষার্থীকে কোন প্রকার সুযোগ দেয়া হয় না প্রশ্ন করার।
২) প্রশ্নোত্তর পদ্ধতিঃ এই পদ্ধতি একটি দ্বিমুখী প্রক্রিয়া। শিক্ষক প্রশ্ন করেন শিক্ষার্থী উত্তর দেয়। শিক্ষার্থীদের শিক্ষককে প্রশ্ন করার কোন অবকাশ নেই। এই পদ্ধতি অনুসরণ করে শিক্ষক ছোট, ছোট প্রশ্নের মাধ্যমে পাঠের বিষয়বস্তুকে শিক্ষার্থীদের কাছে উপস্থাপন করেন। শিক্ষার্থীরা সে সকল প্রশ্নের উত্তর দান করে পাঠ্যবিষয় সম্পর্কে ধারণা লাভ করতে পারে। শিক্ষার্থীদের শিক্ষককে প্রশ্ন করার কোন সুযোগ নেই বা প্রশ্ন করার সুযোগ থাকলেও শিক্ষকরা সময় স্বল্পতার অজুহাত দিয়ে এড়িয়ে যায় ।
৩) প্রদর্শন পদ্ধতিঃ শ্রেণিতে পাঠদান কোনো ঘটনা বা বিষয় প্রত্যক্ষভাবে উপস্থাপনের প্রক্রিয়াই হচ্ছে প্রদর্শন পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে শিক্ষক শিক্ষার্থীদের কিছু করে দেখাবেন। এই পদ্ধতিতে শিক্ষক উপস্থাপকের ভূমিকা পালন করে বিভিন্ন শিক্ষা উপকরণের সাহায্যে এবং মৌখিক বিবৃতির মাধ্যমে বিষয়বস্তু শিক্ষার্থীদের শিখাতে চেষ্টা করেন। এই পদ্ধতির সবচেয়ে ফলদায়ক দিক হলো শিক্ষার্থী সক্রিয় থেকে পাঠ্যবিষয় অনুধাবন করে ফলে পাঠ বহুলাংশে ফলপ্রসূ হয়। এই পদ্ধতিতে পাঠদান করলে শিক্ষার্থীর মনে শিক্ষণীয় বিষয়টি স্থায়ী হয়।
৪) টিউটোরিয়াল পদ্ধতিঃ এ পদ্ধতিতে শিক্ষক পরামর্শদাতার ভূমিকা পালন করেন। শিক্ষার্থীর সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগিয়ে পারষ্পরিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের উপায় খুঁজে বের করে। বর্তমানে এ পদ্ধতি অনুসরণ করে উচ্চতর শ্রেণিতে শিক্ষার্থীদের পাঠের বিশেষ দিকগুলো সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা প্রদান করা হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তাদের পাঠের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর ওপর প্রশ্নোত্তর লিখতে বা নিবন্ধ রচনা করতে দেয়া হয়। বস্তুত এই পদ্ধতি শিক্ষককেন্দ্রিক পাঠদান পদ্ধতির একটি উন্নত ব্যবস্থা।
৫) পূর্ব নির্ধারিত পাঠঃ শিক্ষক পাঠ্যবিষয়ে সহায়ক গ্রন্থ পাঠের নির্দেশ প্রদান করেন। সেই নির্দেশ মতোবেক শিক্ষার্থীরা পাঠ্যবিষয়টি পড়ে ও বুঝে নিজেরাই নিজেদের পাঠ্যবিষয়টি অনুশীলনের মাধ্যমে তাদের চিন্তা-ভাবনা ও মতামত প্রকাশ করে। ফলে শিক্ষার্থীর কল্পনাশক্তি, বিচার-বিশ্লেষণ ক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের দক্ষতা বৃদ্ধি পায়।
২) প্যানেল আলোচনা পদ্ধতিঃ এ পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে থেকে সাধারণত পাঁচ বা ছয়জন প্রতিনিধি আগে থেকে মনোনয়ন দিয়ে একটি প্যানেল তৈরি করা হয়। সেই প্যানেলভুক্ত শিক্ষার্থীরা নির্দিষ্ট বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করে তা শিক্ষার্থীদের সামনে উপস্থাপন করে। শিক্ষক প্যানেলভুক্ত দলের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের দায়িত্ব পালন করেন এবং আলোচনা পরিচালনা করেন। তিনি প্রথমে আলোচ্য বিষয়টি সবার সম্মুখে তুলে ধরেন ও আলোচনার শুরুতে প্রতিনিধিদের ভূমিকা ব্যাখ্যা করেন।
৩) সেমিনারঃ সাধারণত সেমিনার বলতে আলোচনা ও গবেষণার জন্য কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ ও সমস্যামূলক কোনো বিষয়ের উপর নিজেদের মতামত ব্যক্ত করা। প্রাসঙ্গিক গ্রন্থাদি থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করে নির্ধারিত দিনে আলোচনা অনুষ্ঠানে আলোচ্য বিষয়ের উপর সংগৃহীত তথ্যের রিপোর্ট প্রদান করে, এই রিপোর্ট নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা এবং মূল্যায়নের ভিত্তিতে বক্তব্য উপস্থাপন করা হয়। এ কাজ তারা ব্যক্তিগতভাবে একক প্রচেষ্টায় অথবা ছোট ছোট দলগঠন করেও করতে পারে। সেমিনার শিক্ষার্থীদের স্বাধীনভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা বাড়ায় এবং স্বকিয় শিক্ষালাভের একটি উৎকৃষ্ট পন্থা হিসেবে ধরে নেয়া যায়।
৪) সিম্পোজিয়াঃ সিম্পোজিয়া পদ্ধতিতে দুই বা ততোধিক শিক্ষার্থী আলোচ্যবিষয় বা সমস্যার ওপর আগেই প্রবন্ধ রচনা করে নিয়ে আসে। উক্ত বিষয়ে একক/দলগতভাবে বিভিন্ন মতের সংগ্রহ করে আলোচনা সমালোচনার মাধ্যমে পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করে। তবে পরিচালনার দিক থেকে এর কিছু বৈশিষ্ট্য আছে। তারা প্রথমে তাদের লিখিত প্রবন্ধ কিংবা মৌখিক বিবৃতি পেশ করে। বিভিন্ন বক্তা বিষয়টির উপর নতুন তথ্য পরিবেশন করে। এভাবে কয়েকটি বক্তৃতার মাধ্যমে বিষয়গুলো আরো পরিপূর্ণ বিশ্লেষণ করা হয়।
৫) এসাইনেমেন্টঃ অ্যাসাইনমেন্ট হ'ল একটি নির্দিষ্ট সময় বেধে দিয়ে শিক্ষার্থীদের দেয়া একডেমিক কাজের একটি অংশ যা সে ঘরে/ ক্লাসে বসে নিজ দায়িত্বে সম্পন্ন করে। সাধারণত পাঠের অংশ হিসাবে শিক্ষক শিষ্য দ্বারা প্রদত্ত যে কোনও অনুশীলন, বা অধ্যয়নের জন্য প্রস্তাবিত কোনও কাজকে অ্যাসাইনমেন্ট বলে। যে কোনও শিক্ষার মূল লক্ষ্য হ'ল শিক্ষার্থীকে তার নিজের দায়িত্ব নিয়ে কাজ করা শেখানো।
শিক্ষাবিদদের মতে, দেশের সকল শিক্ষার্থীকে সুষম ও মানসম্মত শিক্ষা প্রদানের জন্য শ্রেণি ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব অনেক বেশি। উপযুক্ত পদ্ধতি ও কৌশলের মাধ্যমে পাঠদানকে ফলপ্রসূ করা এবং কার্যকরী পাঠ পরিচালনার ব্যবস্থা গ্রহণকে শ্রেণি ব্যবস্থাপনা বলে। পাঠদান পদ্ধতিকে শিক্ষার্থীর হৃদয়গ্রাহী, তথ্যনির্ভর এবং আকর্ষণীয় করে গড়ে তুলতে হলে শিক্ষককে শ্রেণি-ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিতে হবে। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকদের ক্ষমতা প্রয়োগ ও নিয়ন্ত্রণ সহযোগিতামূলক হতে হবে। শ্রেণি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে যে কোনো ত্রুটি শিক্ষণ শিখনের আধুনিক এ পদ্ধতির সফল বাস্তবায়নে ব্যাঘাত ঘটবে। তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শ্রেণিকক্ষ এমনভাবে স্থাপন ও সাজানো উচিত যাতে শ্রেণিকক্ষটি সহজেই শিক্ষার্থীদের নিকট আর্কষণীয় হয়ে ওঠে। নিজ গৃহে ছেলেমেয়েরা যেমন স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে ঠিক তেমনি আনন্দদায়ক ও আকর্ষণীয় করে শ্রেণিকক্ষ তৈরি করা দরকার শিক্ষার্থীর জন্য।
বর্তমান শিক্ষাদান পদ্ধতি হাতে-কলমে উপকরণ ব্যবহারের মাধ্যমে করতে হয়। বিষয়বস্তুর সাথে মিল রেখে শিক্ষক নিজেই উপকরণ তৈরি করে শিক্ষাদানকার্য পরিচালনা করবেন। শিক্ষকতা কোনো যান্ত্রিক প্রক্রিয়া নয়, শিক্ষকতা হলো এক ধরনের সৃষ্টিধর্মী প্রক্রিয়া। শিক্ষকের বিষয়বস্তু সম্পর্কে যেমন গভীর জ্ঞান অর্জন করা প্রয়োজন, তেমনি শিক্ষাদান পদ্ধতি সম্পর্কে সকল প্রকার ব্যবহারিক গবেষণা ও নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবনে আত্মনিয়োগ করা উচিত। শিক্ষকতা তখনই সার্থক ও সফল হবে যখন শিক্ষকের নিজস্ব বুদ্ধি-বিবেচনা ও চিন্তাশক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর শিখন সহজ ও স্বতঃস্ফূর্ত হবে।
কোরআন এবং হাদিস দ্বারাও তা প্রমাণিত, ‘‘বল, যারা জানে আর যারা জানে না, তারা কি সমান হতে পারে?” (সূরাহ্ যুমার ৩৯/৯)। ”বলা ও করার পূর্বে জ্ঞান আবশ্যক।”
একথা বলা যায় যে, একজন আদর্শ অভিজ্ঞ শিক্ষক তার মেধা ও মননশক্তি খাটিয়ে বুঝতে পারবেন কোন পদ্ধতিতে পাঠদান করলে শতভাগ সফল হবেন এবং তিনি সেই পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাদান করবেন। শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে শিক্ষকের নিজস্ব কৌশল হচ্ছে সবচেয়ে উত্তম কৌশল। তবে শিক্ষককে খেয়াল রাখতে হবে শ্রেণিশাসন কিংবা শ্রেণি নিয়ন্ত্রণের জন্যে শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিকভাবে আঘাত বা চাপ দেয়া কোন অবস্থাতেই কাম্য নয়। প্রয়োজনে হাতে-কলমে শিক্ষাদান করে শিক্ষাদান কার্যক্রমকে আনন্দ ও শ্রুতিমধুর এবং প্রাঞ্জল করে তুলবেন।
যিনি কোনোদিন বিদ্যালয়ে গমন করেননি তিনিও বিভিন্ন বিদ্যায় পারদর্শী। ওই বিদ্যা দ্বারা তিনি জীবিকা নির্বাহ করছেন এবং সমাজও উপকৃত হচ্ছে। বেঁচে থাকার এ সংগ্রামে সহায়ক যা কিছু সবই শিক্ষার অঙ্গীভূত। সুতরাং বলা যায়, অপ্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা হতেই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার উৎপত্তি।
0 মন্তব্যসমূহ