সময় সম্পর্কে জানা কি সম্ভব?
সময় সম্পর্কে জানতে হলে তার আগে আমাদের জানতে হবে সময় কি? সময় হচ্ছে আপনার চলার গতি, যার মাধ্যমে আপনার আমার জীবন ও প্রকৃতি নিজ নিয়মে নিয়ন্ত্রণ হয়। যেমন আগে সেকেন্ড দিয়ে শুরু ছিল। এখন আর তা পরিবর্তন হয়ে ইউক্টোসেকেন্ড ১০−২৪ এস (10−24 s), জেপ্টোসেকেন্ড ১০−২১ এস (10−21 s), এটোসেকেন্ড ১০−১৮ এস (10−18 s), ফেমটোসেকেন্ড ১০−১৫ এস (10−15 s), পিকোসেকেন্ড ১০−১২ এস (10−12 s), ন্যানোসেকেন্ড ১০−৯ এস (10−9 s), মাইক্রোসেকেন্ড ১০−৬ এস (10−6 s), মিলিসেকেন্ড ০.০০১ এস (0.001 s), সেকেন্ড ১ এস (1 s), মিনিট ৬০ সেকেন্ড এভাবে আপনার জীবনের অংশ আস্তে আস্তে বিয়োজন হচ্ছে আপনার জীবন থেকে আর প্রকৃতি গুণছে তার বয়স। বর্তমানে পৃথিবীর বয়স প্রায় ৪৫৪ ± ৫ কোটি বছর (৪.৫৪ × ১০৯ বছর ± ১%)।
আহ্নিক গতি ও বার্ষিক গতির ফলে প্রকৃতি নিয়ন্ত্রণ তা দীর্ঘ একটা সময় বলে ধরে নিতে পারি। আহ্নিক গতির ফলে পৃথিবী-গোলকটা তার নিজের (উত্তর-দক্ষিণ দিক বরাবর) অক্ষের উপরে (প্রায়) প্রতি চব্বিশ ঘণ্টায় একবার প্রদক্ষিণ করে, ফলে পৃথিবীতে (প্রায় সব জায়গাতে) রাত ও দিনের সৃষ্টি হয়। আর বার্ষিক গতির ফলে একই সাথে পৃথিবীর অক্ষটাও প্রতি এক বছরে সূর্যের চারদিক দিয়ে একবার প্রদক্ষিণ করে। আর বার্ষিক গতির ফলে সৃষ্টি হয় বিভিন্ন কয়েকটি ঋতু - যেমন ইউরোপের চারটা আর বাংলাদেশের ছয়টা ঋতু।
যদি আপনি সত্যি সত্যি সময়ের অভিজ্ঞতা নিতে চান, তাহলে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে থাকেন সর্বোচু উঠতে যে সময় লাগে আবার নামতে থাকেন দেখবেন কিছু সময় হলেও আপনার কম লাগছে ।
আসলে প্রাচীনকালের দার্শনিকদের কাছে সময় ছিল এক রহস্যের নাম। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দার্শনিক ও চিন্তাবিদরা সময়ের রহস্য ভেদ করতে চেয়েছেন। কিন্তু কোন কূল কিনারা উনারা খুঁজে পাননি। তারা ধরেই নিয়েছিলেন যে সময় এক অতিপ্রাকৃত বিষয়। আর সে সব দার্শনিক আরও গভীরে গিয়ে অনুসন্ধান করতে চেয়েছেন, তারাও একটি নিশ্চিত উত্তর খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয়েছেন। ফলে একটা সময় তাদের ধারণা হয়েছিল যে, সময় সম্ভবত মানুষের মস্তিষ্কের একধরনের উপলব্ধি।
১) স্প্যানিশ লেখক ও দার্শনিক ব্যালটাজা’র গার্সিয়ান এর মতে, “যার হাতে কিছুই নেই, তার হাতেও সময় আছে। এটাই আসলে সবচেয়ে বড় সম্পদ”।
২) আমেরিকন দার্শনিক মেসন কোলেই এর মতে, “আগের নষ্ট করা সময়ের জন্য এখন আফসোস করলে, এখনকার সময়ও নষ্ট হবে”।
৩) প্রচীন গ্রীক দার্শনিক থিওফ্রেসটাস এর মতে,“তুমি যা কিছু খরচ করো, সময়ই তার মধ্যে সবচেয়ে দামী”।
৪) ফ্রাঞ্চ দার্শনিক যিন ডে লা বরুয়ের মতে, “যারা সময়কে ঠিকমত ব্যবহার করতে পারে না, তারাই আসলে সময় নিয়ে অভিযোগ করে”।
এরপর অনেক সময় চলে গেছে; দর্শনের আধিপত্য শেষ হয়েছে। এখন আধুনিক বিজ্ঞানের যুগ। বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানে, সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
আইনস্টাইন শুধু বিজ্ঞানী তা নয়, তিনি একজন দার্শনিকও ছিলেন । তিনি মানুষের গভীরে গিয়েও অনেক বিশ্লেষণ করেছেন। থিওরি অব রিলেটিভির জনক, বিজ্ঞান জগতে মানুষের ধারণার বহু আগেই তিনি বহু তত্ত্ব লিখে গেছেন। তাঁর কথা-বার্তাতেও ছিলেন প্রচন্ড মেধার বহিঃপ্রকাশ। জীবন ও সময় সম্পর্কে তার গুটিকয়েক উক্তি জেনে নিন। এগুলো বেশ মজার, কিন্তু গভীর অর্থপূর্ণ এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১. 'আমাদের মতো মানুষ, যারা পদার্থবিজ্ঞান বিশ্বাস করেন, তাদের কাছে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের পার্থক্যটা স্থির ও অনমনীয় ভ্রমের চেয়ে বেশি কিছু নয়'।
২. 'কল্পনাশক্তি জ্ঞানের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। জ্ঞান সীমিত। কিন্তু কল্পনা পৃথিবীটাকে প্রদক্ষিণ করে'।
৩. 'একজন সুখী মানুষ তিনিই যিনি ভবিষ্যতে অতিমাত্রায় অধিষ্ঠিত হতে বর্তমান নিয়ে অতি বেশি সন্তুষ্ট থাকেন'।
৪. 'শিক্ষার্থী কি জানেন না তা বুঝতেই বিভিন্ন প্রশ্ন করে সময়ের অপচয় করেন অধিকাংশ শিক্ষক। অথচ প্রশ্ন করার শৈল্পিক রূপ তাই যার মাধ্যমে জানা যাবে শিক্ষার্থীরা কি জানেন অথবা কতটুকু জানতে পারদর্শী'।
৫. 'যখন একজন পুরুষ সুন্দরী নারীর পাশে এক ঘণ্টা ধরে বসে থাকেন, তখন মনে হয় মাত্র এক মিনিট পেরিয়েছে। কিন্তু তাকে একটি গরম চুলার ওপর বসিয়ে দিলে এক মিনিটই মনে হবে এক ঘণ্টার চেয়ে বেশি। এটাই রিলেটিভিটি'।
দৈনন্দিন জীবনে আমরা ঘড়ি দিয়েই সময়কে বুঝে নেই । কিন্তু সময় তো আর ঘড়ির উপর নির্ভর করে চলে না। ঘড়ির কাটা থেমে থাকলেও সময় বয়েই চলে। অনেক ক্ষেত্রে ঘড়ির এক ঘণ্টা পার হলেও আমাদের কাছে মনে হয় যেন এক ঘন্টার অনেক বেশি সময় চলে গেছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে এর উল্টোটিও ঘটে। আসলে, সময় একটি ব্যক্তি নিরপেক্ষ জিনিস হলেও আমরা আমাদের মস্তিষ্কের সাহায্যেই সময়কে অনুভব করে থাকি। ফলে সময় নিয়ে সঠিক ও পরিপূর্ণ ধারণা পেতে হলে শুধু পদার্থবিজ্ঞানের উপর নির্ভর করলেই চলে না। পাশাপাশি শারীরতত্ত্ব, স্নায়ুবিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞানের মত বিষয়ের উপরও নির্ভর করতে হয়। আর পদার্থবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে বিচার করতে গেলে খুব কম কথায় সময় বিষয়টিকে সংজ্ঞায়িত করাও বেশ কঠিন। তাই সময়ের সঠিক বিশ্লেষণের জন্য এর ভৌত রূপের (পদার্থবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে) পাশাপাশি মনস্তাত্ত্বিক দিকটিও (শারীরবিজ্ঞান ও স্নায়ুবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে) জানার প্রয়োজন রয়েছে ।
“সময় চলে যায় যায়রে, সময় বয়ে যায় যায়রে, বলবার থাকে যদি কিছু বল এখনি, করবার থাকে যদি কিছু কর এখনি”।


0 মন্তব্যসমূহ